প্রবন্ধ /নিবন্ধ

শবে বরাত : প্রান্তিকতামুক্ত প্রামাণ্য একটি পর্যালোচনা

বিদআত ও কুসংস্কার

শবে বরাত : প্রান্তিকতামুক্ত প্রামাণ্য একটি পর্যালোচনা?
বিদআত ও কুসংস্কার !
প্রতি বছর শাবানের পনেরো তারিখ আসলেই এটাকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। কারও মতে এটা শবে কদরের মতোই বা তার চেয়েও দামী একটি রাত। আর ভিন্ন আরেক দলের নিকট এটা একেবারেই সাধারণ একটি রাত, যার বিশেষ কোনো ফজিলত বা গুরুত্ব নেই। আসলে বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা সঠিক পর্যালোচনার অভাবেই মানুষের মাঝে এমন ভুল ধারণার প্রসার ঘটেছে। এ বিষয়ে যেমন অধিক বাড়াবাড়ি কাম্য নয়, ঠিক তেমনই বেশি ছাড়াছাড়িও উচিত নয়। উভয় প্রান্তিকতাই বর্জনযোগ্য। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটিতে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে পূর্ণ সততা ও সতর্কতার সাথে একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরছি। আশা করছি, এতে শবে বরাতে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে।

আমাদের দেশে শবে বরাত নিয়ে মৌলিকভাবে তিনটি বিষয়ে বিতর্ক হয়ে থাকে। এক. শবে বরাতের ফজিলত থাকা ও না থাকা নিয়ে। দুই. শবে বরাতে একাকী বা সম্মিলিতভাবে ইবাদত করা ও না করা নিয়ে। তিন. শবে বরাতের পরের দিন রোজা রাখা ও না রাখা নিয়ে। পাশাপাশি শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আরেকটি শ্রেণি বিভিন্ন রুসম-রেওয়াজ ও বিদআত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের আমল থেকে প্রমাণিত নয়। মোটকথা, এটা নিয়ে মানুষের মাঝে প্রচুর পরিমাণে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ ঘরানার বড়দের কথা বা ফতোয়াকে দলিল হিসেবে পেশ করে, যার কারণে নিরপেক্ষ শ্রেণির লোকেরা এ ব্যাপারে সঠিক ফয়সালা জানতে পারে না। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটিতে আমরা পাঁচটি অধ্যায়ে এ ব্যাপারে দালিলিকভাবে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরছি।

প্রথম অধ্যায় : শবে বরাতের প্রামাণ্যতা ও ফজিলত
দ্বিতীয় অধ্যায় : শবে বরাতের ইবাদত ও আমল
তৃতীয় অধ্যায় : শবে বরাতের পরদিন রোজা
চতুর্থ অধ্যায় : শবে বরাতে করণীয় কাজসমূহ
পঞ্চম অধ্যায় : শবে বরাতে বর্জনীয় কাজসমূহ

প্রথম অধ্যায় : শবে বরাতের প্রামাণ্যতা ও ফজিলত

‘শবে বরাত’ ফারসি শব্দ। ‘শব’ অর্থ রাত, আর ‘বরাত’ অর্থ সৌভাগ্য। অবশ্য ‘বরাত’ যদি আরবি হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে মুক্তি। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়াল সৌভাগ্য বা মুক্তির রজনী। যেহেতু এ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ থেকে মুক্ত করে সৌভাগ্যের চাদরে আচ্ছাদিত করেন, তাই এ রাতকে শবে বরাত বলা হয়। তবে মনে রাখা দরকার যে, এটি ইসলামি বা শরয়ি কোনো পরিভাষা নয়। এ রাতের ক্ষেত্রে হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে, ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রজনী। এটির উচ্চারণ অধিকাংশ লোকের নিকট নতুন ও কঠিন হওয়ায় প্রবন্ধটিতে আমরা এ রাত বুঝাতে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ এর পরিবর্তে ‘শবে বরাত’ ব্যবহার করেছি। এখন আমাদের দেখার বিষয় হলো, কুরআন-সুন্নাহয় এ ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা শবে বরাতের অস্তিত্ব ও এর কোনো ফজিলতের কথা এসেছে কিনা। এ ব্যাপারে সঠিক মত হলো, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কুরআনে এর কোনো আলোচনা আসেনি। তবে সহিহ হাদিস দ্বারা এ রাতের ফজিলত ও গুরুত্বের বিষয়টি প্রমাণিত। কিছু মানুষ সুরা দুখানের একটি আয়াত দ্বারা কুরআনে ‘শবে বরাত’ এর অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে। কিন্তু এটা অধিকাংশ মুফাসসিরের মত ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের পরিপন্থী। তাই তাদের এ প্রচেষ্টা সঠিক নয়; বরং অপব্যাখ্যার শামিল।

সুরা দুখানে ইরশাদ হয়েছে :

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ
‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।’ (সুরা আদ-দুখান : ৩)

বিশুদ্ধ মতানুসারে এ আয়াতে لَيْلَة مُبَارَكَة বা বরকতময় রাত বলতে শবে কদর উদ্দেশ্য, শবে বরাত নয়। যেহেতু এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এ আয়াতে বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কথাই বলা হয়েছে। অতএব, এ আয়াতে উদ্ধৃত ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত বলতে শবে কদর উদ্দেশ্য হবে, শবে বরাত নয়। এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরের মত।

ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন :
اللَّيْلَةُ الْمُبَارَكَةُ لَيْلَةُ الْقَدْرِ… وَقَالَ عكرمة: الليلة المباركة ها هنا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ. وَالْأَوَّلُ أَصَحُّ لِقَوْلِهِ تعالى: إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
‘বরকতময় রাত হলো শবে কদর। …ইকরামা রহ. বলেছেন, বরকতময় রাত বলতে এখানে শবে বরাত উদ্দেশ্য। তবে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি।”’ (তাফসিরুল কুরতুবি : ১৬/১২৬, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)

ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন :
يَقُولُ تَعَالَى مُخْبِرًا عَنِ الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ إِنَّهُ أَنْزَلَهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ، وَهِيَ ليلة القدر كما قال عَزَّ وَجَلَّ: إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ… وَمَنْ قَالَ: إِنَّهَا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ كَمَا رُوِيَ عَنْ عِكْرِمَةَ فَقَدْ أَبْعَدَ النُّجْعَةَ، فَإِنَّ نَصَّ الْقُرْآنِ أَنَّهَا فِي رَمَضَانَ.
‘আল্লাহ তাআলা কুরআনের ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন যে, এটাকে তিনি বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছেন। আর সেটা হলো শবে কদর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি।” …আর যারা বলে যে, এ রাতটি হলো, মধ্য শাবানের রাত তথা শবে বরাত -যেমনটি ইকরামা রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে- তারা প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে। কেননা, কুরআনের সুস্পষ্ট ভাষ্য হলো, শবে কদর রমজান মাসে হয়।’ (তাফসিরু ইবনি কাসির : ৭/২২৫, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

ইমাম রাজি রহ. বলেন :
وَأَمَّا الْقَائِلُونَ بِأَنَّ الْمُرَادَ مِنَ اللَّيْلَةِ الْمُبَارَكَةِ الْمَذْكُورَةِ فِي هَذِهِ الْآيَةِ، هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَمَا رَأَيْتُ لَهُمْ فِيهِ دَلِيلًا يُعَوَّلُ عَلَيْهِ، وَإِنَّمَا قَنِعُوا فِيهِ بِأَنْ نَقَلُوهُ عَنْ بَعْضِ النَّاسِ، فَإِنْ صَحَّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ كَلَامٌ فَلَا مَزِيدَ عَلَيْهِ، وَإِلَّا فَالْحَقُّ هُوَ الْأَوَّلُ.
‘যারা উল্লিখিত আয়াতে বরকতময় রাত বলতে শবে বরাত বুঝেছেন, তাদের পক্ষে আমি নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ দেখি না। তারা এ ব্যাপারে কতিপয় লোক থেকে বর্ণিত উক্তির ওপর নির্ভর করেছে। যদি এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো বর্ণনা প্রমাণিত হতো, তাহলে এর ওপর অতিরিক্ত কোনো কথা বলার সুযোগ ছিল না। নচেৎ প্রথম মতটিই বিশুদ্ধ ও সঠিক।’ (তাফসিরুর রাজি : ২৭/৬৫৩, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

ইমাম তাবারি রহ. বলেন :
وَاخْتَلَفَ أَهْلُ التَّأْوِيلِ فِي تِلْكَ اللَّيْلَةِ، أَيُّ لَيْلَةٍ مِنْ لَيَالِي السَّنَةِ هِيَ؟ فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هِيَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ…. وَقَالَ آخَرُونَ: بَلْ هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَالصَّوَابُ مِنَ الْقَوْلِ فِي ذَلِكَ قَوْلُ مَنْ قَالَ: عَنَى بِهَا لَيْلَةَ الْقَدْرِ.
‘মুফাসসিরগণ এ বরকতময় রাতের ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন যে, তা বছরের কোন রাত? কারও মতে তা হলো শবে কদর। …আর কারও মতে, বরং সেটা হলো শবে বরাত। তবে এক্ষেত্রে তাদের মতটিই সঠিক, যারা বলেন, এদ্বারা শবে কদর উদ্দেশ্য।’ (তাফসিরুত তাবারি : ২২/৭-৮, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)

আল্লামা আলুসি রহ. বলেন :
لَيْلَة مُبارَكَة هي ليلة القدر على ما روي عن ابن عباس وقتادة وابن جبير ومجاهد، وابن زيد والحسن وعليه أكثر المفسرين والظواهر معهم.
‘বরকতময় রাত হলো শবে কদর; যেমনটি ইবনে আব্বাস রা., কাতাদা রহ., ইবনে জুবাইর রহ., মুজাহিদ রহ., ইবনে জাইদ রহ. ও হাসান রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর অধিকাংশ মুফাসসিরের মত এমনই। সুস্পষ্ট প্রমাণাদিও এদের পক্ষে কথা বলে।’ (রুহুল মাআনি : ১৩/১১০, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

এ থেকে থেকে প্রমাণিত হলো যে, সুরা দুখানে যে বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটা হলো শবে কদর, শবে বরাত নয়। এতে সামান্য একটু মতানৈক্য থাকলেও ‘শবে বরাত’ হওয়ার দাবিটি গুটিকয়েকজনের মত ও প্রমাণহীন হওয়ায় অধিকাংশ মুফাসসিরই তা গ্রহণ করেননি। অতএব, কুরআন থেকে শবে বরাত সাব্যস্ত হয় না। এরপরও যারা কুরআন থেকে জোর করে ‘শবে বরাত’ সাব্যস্ত করতে চায়, তারা মূলত শাজ বা বিচ্ছিন্ন এক মতের ভিত্তিতে কথা বলে, যা মুহাক্কিক আলিমদের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এবার আমরা দেখব, হাদিসে এর অস্তিত্ব আছে কিনা। নির্ভরযোগ্য হাদিসের গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, শবে বরাত-সংক্রান্ত বেশ কিছু হাদিস পাওয়া যায়। সনদগত দিক থেকে হাদিসগুলোর সনদ জইফ হলেও সামগ্রিক বিবেচনায় সব মিলে হাদিস সহিহ হয়ে যায়।

সহিহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ.
‘মুআজ বিন জাবাল রা. সূত্রে রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের পনেরো তারিখ রাতে তাঁর সৃষ্টিকূলের দিকে (বিশেষ রহমতের) দৃষ্টি দেন। অতঃপর মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহু ইবনি হিব্বান : ১২/৪৮১, হা. নং ৫৬৬৫, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)

এ হাদিসটির সনদ জইফ বা দুর্বল হলেও একাধিক সাহাবি সূত্রে এর আরও অনেক সনদ থাকায় হাদিসটি ‘সহিহ’ এর মানে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, যা আহকাম বা ফাজায়িল সব ক্ষেত্রেই প্রমাণযোগ্য।

শাইখ আলবানি রহ. এ হাদিসটির ব্যাপারে মন্তব্য করেন :
حديث صحيح، روي عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا وهم معاذابن جبل وأبو ثعلبة الخشني وعبد الله بن عمرو وأبي موسى الأشعري وأبي هريرة وأبي بكر الصديق وعوف ابن مالك وعائشة.
‘হাদিসটি সহিহ। এক দল সাহাবি থেকে বিভিন্ন সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, যার একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। সে সকল সাহাবিগণ হলেন, মুআজ বিন জাবাল রা., আবু সালাবা রা., আব্দুল্লাহ বিন উমর রা., আবু মুসা আশআরি রা., আবু হুরাইরা রা., আবু বকর সিদ্দিক রা., আওফ বিন মালিক রা., আয়িশা সিদ্দিকা রা.। (সিলসিলাতুস আহাদিসিস সহিহা : ৩/১৩৫, হা. নং ১১৪৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ)

শাইখ শুআইব আরনাউত রহ. বলেন :
حديث صحيح بشواهده، وهذا إسناد ضعيف.
‘এর সনদ দুর্বল হলেও অন্যান্য সমার্থক হাদিসগুলোর কারণে হাদিসটি সহিহ বলে বিবেচিত।’ (আত-তালিক আলা মুসনাদি আহমাদ : ১১/২১৭, হা. নং ৬৬৪২, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)

এ হাদিসটি আরও অনেক হাদিসগ্রন্থে সামান্য কয়েকটি শব্দের ভিন্নতায় বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। আমরা এখানে কয়েকটি হাদিসগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছি এবং এসব হাদিস থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত কথাগুলোও শেষে উল্লেখ করে দিচ্ছি।
(১) মুসনাদু ইসহাক বিন রাহুইয়াহ : ৩/৯৮১, হা. নং ১৭০২
(২) সুনানু ইবনি মাজাহ : /৪৪৫, হা. নং ১৩৯০
(৩) আস-সুন্নাহ, ইবনু আবি আসিম : ১/২২৩, হা. নং ৫১০
(৪) মুসনাদুল বাজ্জার : ৭/১৮৬, হা. নং ২৭৫৪
(৫) মুসতাখরাজুত তুসি আলা জামিইত তিরমিজি : ৩/৩৮৭, হা. নং ৬১/৬৮৪
(৬) আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৭/৩৬, হা. নং ৬৭৭৬
(৭) আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : ২০/১০৮, হা. নং ২১৫
(৮) মুসনাদুশ শামিয়্যিন, তাবারানি : ১/১২৮, হা. নং ২০৩
(৯) শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৯/২৪, হা. নং ৬২০৪
(১০) মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৬/১০৮, হা. নং ২৯৮৫৯

এসব কিতাবে বর্ণিত হাদিসগুলোর সারমর্ম প্রায় সব একই। তবে এ রাতে আল্লাহ যাদের ক্ষমা করবেন না, তাদের আরও কয়েকটি শ্রেণির নাম জানা যায়। সামগ্রিকভাবে সব হাদিস অনুসন্ধান করে মোট সাত শ্রেণির লোকের কথা পাওয়া যায়, যাদেরকে আল্লাহ শবে বরাতের এ বিশেষ রাতেও ক্ষমা করবেন না। তারা হলো, (১) মদ্যপায়ী বা নেশাগ্রস্ত। (২) মুশরিক বা শিরকে লিপ্ত। (৩) কোনো মুমিন ভাইয়ের সাথে অন্যায়ভাবে বিদ্বেষ পোষণকারী। (৪) আত্মহত্যাকারী। (৫) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী। (৬) টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী। (৭) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।

সুতরাং এতগুলো হাদিসের সমষ্টিতে বুঝা গেল যে, হাদিসের আলোকে শবে বরাত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এমনকি আহলে হাদিসগণ যাকে মান্যবর বলে মনে করেন, সেই শাইখ আলবানি রহ.-ও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন।

শাইখ আলবানি রহ. বলেন :
وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب والصحة تثبت بأقل منها عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث، فما نقله الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في “إصلاح المساجد” (ص 107) عن أهل التعديل والتجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح، فليس مما ينبغي الاعتماد عليه، ولئن كان أحد منهم أطلق مثل هذا القول فإنما أوتي من قبل التسرع وعدم وسع الجهد لتتبع الطرق على هذا النحو الذي بين يديك. والله تعالى هو الموفق.
‘সারকথা হলো, এত সব সনদের সমষ্টিতে হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ বলে বিবেচিত। মারাত্মক দুর্বলতা না থাকলে তো এর চেয়ে কম সনদেও হাদিস সহিহ সাব্যস্ত হয়ে যায়, যেমনটি এ হাদিসের ক্ষেত্রে ঘটেছে। সুতরাং শাইখ কাসিমি রহ. তাঁর “ইসলাহুল মাসাজিদ” গ্রন্থে (পৃ. ১০৭) প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিসদের থেকে শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস না থাকার যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয়। আর যদি কেউ এমন কথা বলেও থাকেন তাহলে তা তাড়াহুড়াবশত ও আমাদের এই পদ্ধতিতে পূর্ণভাবে সকল সূত্র তালাশ না করেই বলে থাকবেন হয়তো।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা : ৩/১৩৯, হা. নং ১১৪৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ)

এছাড়াও সালাফে সালিহিনের আরও অনেকেই এ রাতের ফজিলতের কথা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা এ রাতের ফজিলত ও আমলের বিষয়ে সালাফের অনেকের বক্তব্য উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ। এখানে আমরা কয়েকজন বিজ্ঞ ফকিহ ও আলিমের নাম উল্লেখ করছি, যারা আহলে হাদিসদের কাছেও মান্যবর; অথচ তারা শবে বরাতের ফজিলতের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
ليلة النصف من شعبان، فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها.
‘শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক মারফু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এটা ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। সালাফের অনেকে বিশেষভাবে এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন।’ (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম : ২/১৩৬-১৩৭, প্রকাশনী : দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)

হাফিজ ইবনে হাজার হাইসামি রহ. বলেন :
وَالْحَاصِلُ أَنَّ لِهَذِهِ اللَّيْلَةِ فَضْلًا وَأَنَّهُ يَقَعُ فِيهَا مَغْفِرَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَاسْتِجَابَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَمِنْ ثَمَّ قَالَ الشَّافِعِيُّ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِيهَا.
‘সারকথা হলো, শবে বরাতের ফজিলত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এ রাতে বিশেষভাবে ক্ষমা করা হয় এবং বিশেষভাবে দুআ কবুল করা হয়। এ ভিত্তিতেই ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেছেন, এ রাতে দুআ করা মুসতাহাব।’ (আল-ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কুবরা : ২/৮০, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যা)

আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরি রহ. বলেন :
اعْلَمْ أَنَّهُ قَدْ وَرَدَ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ عِدَّةُ أَحَادِيثَ مَجْمُوعُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا.
‘জেনে রেখো যে, শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সমষ্টিগতভাবে যা প্রমাণ করে যে, এর ভিত্তি আছে।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/৩৬৫, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

তিনি আরও বলেন :
فَهَذِهِ الْأَحَادِيثُ بِمَجْمُوعِهَا حُجَّةٌ عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ شَيْءٌ.
‘সামগ্রিকভাবে এ হাদিসগুলো ওই সব লোকদের বিপরীতে দলিল হবে, যারা ধারণা করে যে, শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে কোনো কিছু প্রমাণিত নয়।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/৩৬৭, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

দ্বিতীয় অধ্যায় : শবে বরাতের আমল ও ইবাদত

শবে বরাতের ফজিলত সহিহ হাদিসের আলোকের সুসাব্যস্ত হলেও এ রাতে আমল করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সালাফের মাঝে বেশ ইখতিলাফ দেখা যায়। আমরা এখানে তাদের মধ্যকার ইখতিলাফ উল্লেখ করে এ ব্যাপারে সঠিক ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতটি দালিলিকভাবে তুলে ধরছি।
মুলত এ রাতে ইবাদত করার বিষয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। এক. হিজাজের ফুকাহায়ে কিরাম। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আতা রহ., ইবনে আবি মুলাইকা রহ., মালিক রহ. ও মদিনার ফকিহগণ। তারা বলেন, এ রাতে আলাদাভাবে কোনো অতিরিক্ত ইবাদত করা বিদআত হবে। কারণ, এ ব্যাপারে কোনো নস পাওয়া যায় না। দুই. সিরিয়ার ফুকাহায়ে কিরাম। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, মাকহুল রহ., খালিদ বিন মাদান রহ., লুকমান বিন আমির রহ., আওজায়ি রহ., ইসহাক বিন রাহুয়াহ রহ. প্রমুখ। তারা বলেন, এ রাতে ইবাদত করা যাবে। তবে ঘরে বসে ব্যক্তিগতভাবে নাকি মসজিদে এসে সবাই মিলে, এটা নিয়ে আবার দুটি মত পাওয়া যায়। ইমাম ইসহাক রহ.-এর মত হলো মসজিদে এসে সবাই মিলে ইবাদত করা যাবে। আর ইমাম আওজায়ি রহ.-এর মত হলো, না, এটা বরং ঘরে একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে করতে হবে, মসজিদে এসে এলান করে ইবাদত করার অনুমতি নেই।

হাফিজ ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এ রাতের ইবাদতের ব্যাপারে মতানৈক্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
وليلة النصف من شعبان كان التابعون من أهل الشام كخالد بن معدان ومكحول ولقمان بن عامر وغيرهم يعظمونها ويجتهدون فيها في العبادة وعنهم أخذ الناس فضلها وتعظيمها… وأنكر ذلك أكثر علماء الحجاز منهم عطاء وابن أبي مليكة ونقله عبد الرحمن بن زيد بن أسلم عن فقهاء أهل المدينة وهو قول أصحاب مالك وغيرهم وقالوا: ذلك كله بدعة.
‘আর তাবিয়িদের মধ্য হতে মাকহুল রহ., খালিদ বিন মাদান রহ. ও লুকমান বিন আমির রহ. প্রমুখ শবে বরাতকে সম্মানিত রাত মনে করতেন এবং এ রাতে বিশেষভাবে ইবাদত করতেন। তাঁদের থেকে লোকেরা এ রাতের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়টি গ্রহণ করেছে। …কিন্তু হিজাজের অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আতা রহ., ইবনে আবি মুলাইকা রহ.। আব্দুর রহমান বিন জাইদ রহ. এ মতটি মদিনার ফকিহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আর এটাই ইমাম মালিক রহ.-এর অনুসারী ও অন্যান্যদের মত। তারা বলেন, এগুলো সব বিদআত।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ : পৃ. নং ১৩৭, প্রকাশনী : দারু ইবনি হাজাম)

এ দুটি মত হতে শক্তিশালী মত হলো, ব্যক্তিগতভাবে একাকী ঘরে বসে ইবাদত করা যাবে, তবে দলবদ্ধভাবে বা একাকী মসজিদে এসে জমায়েত হওয়া যাবে না। কারণ, একটি গ্রহণযোগ্য মুরসাল হাদিসে এ রাতে ঘরে বসে ইবাদত করার বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। তাই ইবাদত বিষয়ক মাসআলায় অতিরিক্ত কিয়াস না করে এ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে যারা বলেছেন যে, ঘরে একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করার যাবে, তাদের মতটিই অধিক শক্তিশালী।
হাদিসটি ইমাম বাইহাকি রহ. বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজ সনদে বলেন :
أَخْبَرَنَا أَبُو نَصْرِ بْنُ قَتَادَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو مَنْصُورٍ مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ الْأَزْهَرِيِّ الْهَرَوِيُّ، حَدَّثَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ إِدْرِيسَ، حَدَّثَنَا أَبُو عُبَيْدِ اللهِ ابْنُ أَخِي ابْنِ وَهْبٍ، حَدَّثَنَا عَمِّي، حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ صَالِحٍ، عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ، أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّي فَأَطَالَ السُّجُودَ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ قَدْ قُبِضَ، فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ قُمْتُ حَتَّى حَرَّكْتُ إِبْهَامَهُ فَتَحَرَّكَ، فَرَجَعْتُ، فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السُّجُودِ، وَفَرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ، قَالَ: ” يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ ظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ خَاسَ بِكِ؟ “، قُلْتُ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُولِ سُجُودِكَ، فَقَالَ: ” أَتَدْرِينَ أَيَّ لَيْلَةٍ هَذِهِ؟ “، قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ” هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ
‘আয়িশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক রাতে নামাজ পড়তে লাগলেন। নামাজে সিজদা এত দীর্ঘায়িত করলেন যে, আমি ধারণা করছিলাম, তিনি বোধহয় দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন। আমি এটা দেখার পর উঠে গিয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুলে নাড়া দিলাম। এরপর তিনি নড়ে উঠলে আমি নিজের জায়গায় ফিরে আসলাম। এরপর যখন সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে নামাজ শেষ করলেন, তখন বললেন, হে আয়িশা, তুমি ধারণা করেছিলে, আল্লাহর নবি তোমার সাথে অঙ্গিকার ভঙ্গ করবেন? আমি বললাম, সত্যিই না, ইয়া রাসুলাল্লাহ। তবে আমি আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে ধারণা করেছিলাম, আপনার মৃত্যু হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জানো, আজ কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আজ হলো মধ্য শাবানের রজনী (১৫ তারিখের রাত তথা শবে বরাত)। আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রজনীতে বান্দাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন, অতঃপর ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করে দেন, দয়াপ্রত্যাশীদের দয়া করেন, কিন্তু বিদ্বেষ পোষণকারীদের আপন অবস্থায় রেখে দেন অর্থাৎ তাদের ক্ষমা করেন না।’ (শুআবুল ইমান : ৫/৩৬১-৩৬২, হা. নং ৩৫৫৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)

ইমাম বাইহাকি রহ. হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে বলেন :
قُلْتُ: هَذَا مُرْسَلٌ جَيِّدٌ وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ الْعَلَاء بْنُ الْحَارِثِ أَخَذَهُ مِنْ مَكْحُولٍ وَاللهُ أَعْلَمُ،
‘আমি বলব, এটা ভালো মুরসাল একটি হাদিস। সম্ভাবনা আছে যে, আলা বিন হারিস রহ. হাদিসটি মাকহুল রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।’ (শুআবুল ইমান : ৫/৩৬২, হা. নং ৩৫৫৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)

সাধারণত কোনো তাবিয়ি কর্তৃক কোনো একটি হাদিস সাহাবির সূত্র উল্লেখ না করে সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হলে সে হাদিসকে মুরসাল বলা হয়। অবশ্য কখনো ‘মুনকাতি’ বা সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদিসকেও মুরসাল বলে পরিচয় দেওয়া হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থে মুরসাল বলা হয়েছে। এ হাদিসটি মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন হলেও ইমাম বাইহাকি রহ. যেহেতু হাদিসটিকে জাইয়িদ বা ভালো বলে মন্তব্য করেছেন; এতে বুঝা যায়, এটা গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। এর কারণও তিনি ইঙ্গিতে বলে দিয়েছেন যে, আলা বিন হারিস রহ. হাদিসটি সম্ভবত মাকহুল রহ. সূত্রে আয়িশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। আর এমনটা হলে তো হাদিসটি নিয়ে কারও কোনো কথা থাকে না। আর এজন্যই এটাকে তিনি সরাসরি সহিহ না বলে জাইয়িদ বলেছেন, যা হাসান স্তরের হাদিস। আর সহিহ ও হাসান উভয় স্তরের হাদিস দিয়েই শরিয়তের মাসআলা সাব্যস্ত করা যায়। আর ফাজায়িলের ক্ষেত্রে তো দুর্বল হাদিসও গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং শবে বরাতে ব্যক্তিগতভাবে একটু ভালোভাবে সময় নিয়ে ইবাদত করা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হলো তখন এটাকে বিদআত বলার অবকাশ নেই। তাই এ মাসআলায় হিজাজের ফুকাহায়ে কিরামের চাইতে সিরিয়ার ফুকাহায়ে কিরামের মতই অধিক শক্তিশালী হবে। তবে ইবাদতের ক্ষেত্রে যেহেতু নিয়ম হলো, এতে নিজের পক্ষ থেকে কিয়াস বা অনুমান করে কোনো কিছু বাড়তি-কমতি করা যাবে না; বিধায় এ রাতে ইবাদতের নামে মসজিদে একত্রিত হওয়া এবং সবাই মিলে সেখানে রাত জেগে ইবাদত করা ঠিক হবে না। বরং এটা একটি অতিরিক্ত রুসুমে পরিণত হবে, যার কোনো প্রমাণ কুরআন ও সুন্নাহয় নেই।

এ রাতে অতিরিক্ত কিছু নফল ইবাদত ও দুআ করার ব্যাপারে আরও অনেক সালাফ ও ইমামের মত পাওয়া যায়। আমরা এখানে তাদের কয়েকজনের থেকে এ বিষয়ে মতামত উল্লেখ করছি।

ইবনে উমর রা. বলেন :
خَمْسُ لَيَالٍ لَا تُرَدُّ فِيهِنَّ الدُّعَاءَ: لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ، وَأَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَلَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ
‘পাঁচ রাতের দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। এক. জুমআর রাতে। দুই. রজবের প্রথম রাতে। তিন. মধ্য শাবানের রাতে। চার. ইদুল ফিতরের রাতে। পাঁচ. ইদুল আজহার রাতে।’ (মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক : ৪/৩১৭, হা. নং ৭৯২৭, প্রকাশনী : আল-মাজলিসুল ইলমি, ভারত)

ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন :
وَبَلَغَنَا أَنَّهُ كَانَ يُقَالُ: إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِي خَمْسِ لَيَالٍ فِي لَيْلَةِ الْجُمُعَةِ، وَلَيْلَةِ الْأَضْحَى، وَلَيْلَةِ الْفِطْرِ، وَأَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ… (قَالَ الشَّافِعِيُّ) : وَأَنَا أَسْتَحِبُّ كُلَّ مَا حُكِيَتْ فِي هَذِهِ اللَّيَالِيِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُونَ فَرْضًا.
‘আমাদের কাছে এ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, বলা হয়, পাঁচ রাতে দুআ কবুল হয়। এক. জুমআর রাতে। দুই. ইদুল আজহার রাতে। তিন. ইদুল ফিতরের রাতে। চার. রজবের প্রথম রাতে। পাঁচ. মধ্য শাবানের রাতে। …(ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন,) আর আমি এসব রাতের ব্যাপারে যা বর্ণনা করলাম, তা করা (অর্থাৎ দুআ করা) পছন্দ করি। তবে এটা আবশ্যক কিছু নয়।’ (আল-উম্মু : ১/২৬৪, প্রকাশনী : দারুল মারিফা, বৈরুত)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
وَأَمَّا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَفِيهَا فَضْلٌ، وَكَانَ فِي السَّلَفِ مَنْ يُصَلِّي فِيهَا، لَكِنَّ الِاجْتِمَاعَ فِيهَا لِإِحْيَائِهَا فِي الْمَسَاجِدِ بِدْعَةٌ وَكَذَلِكَ الصَّلَاةُ الْأَلْفِيَّةُ.
‘শবে বরাতের ব্যাপারে কথা হলো, এ রাতের ফজিলত আছে। সালাফের মধ্যে অনেকেই এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন। কিন্তু রাত্রি জাগরনের উদ্দেশ্যে এ রাতে মসজিদে একত্রিত হওয়া বিদআত। এভাবে আলফিয়া বা হাজার রাকআত নামের বিশেষ নামাজও বিদআত।’ (আল-ফাতাওয়াল কুবরা : ৫/৩৪৪, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আরও বলেন :
ليلة النصف من شعبان، فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها، وصوم شهر شعبان قد جاءت فيه أحاديث صحيحة. ومن العلماء: من السلف من أهل المدينة، وغيرهم من الخلف، من أنكر فضلها، وطعن في الأحاديث الواردة فيها، كحديث: «إن الله يغفر فيها لأكثر من عدد شعر غنم كلب». وقال: لا فرق بينها وبين غيرها. لكن الذي عليه كثير من أهل العلم، أو أكثرهم، من أصحابنا وغيرهم -على تفضيلها، وعليه يدل نص أحمد، لتعدد الأحاديث الواردة فيها، وما يصدق ذلك من الآثار السلفية، وقد روي بعض فضائلها في المسانيد والسنن. وإن كان قد وضع فيها أشياء أخر.
‘শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক মারফু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এটা ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। সালাফের অনেকে বিশেষভাবে এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন। আর শাবান মাসে রোজা রাখার ব্যাপারে অনেক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সালাফের মধ্য হতে মদিনার উলামায়ে কিরাম ও পরবর্তী কিছু উলামায়ে কিরাম এ রাতের ফজিলত অস্বীকার করেছেন এবং এসংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসগুলোর ব্যাপারে বিতর্ক করেছেন। যেমন এ হাদিস যে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এ রাতে কালব গোত্রের ছাগলের পালের চেয়েও অধিকসংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন।’ তাঁরা বলেন, এ রাত ও অন্যান্য রাতের মাঝে তেমন পার্থক্য নেই। কিন্তু আমাদের ও অন্যান্য মাজহাবের অনেক বা অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মত হলো, এ রাতের আলাদা ফজিলত আছে। ইমাম আহমাদ রহ.-এর ভাষ্য এমনটাই বুঝায়। কেননা, এ রাতের ফজিলতের হাদিসগুলো একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়াও (এ ব্যাপারে) সালাফের আসার ও আমলও তা সত্যায়ন করে। এ রাতে কিছু ফজিলত মুসনাদ ও সুনানের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে; যদিও এ ব্যাপারে বেশ কিছু মওজু হাদিসও আছে।’ (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম : ২/১৩৬-১৩৭, প্রকাশনী : দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)

ইমাম নববি রহ. বলেন :
وَاسْتَحَبَّ الشَّافِعِيُّ وَالْأَصْحَابُ الْإِحْيَاءَ الْمَذْكُورَ مَعَ أَنَّ الْحَدِيثَ ضَعِيفٌ لِمَا سَبَقَ فِي أَوَّلِ الْكِتَابِ أَنَّ أَحَادِيثَ الْفَضَائِلِ يُتَسَامَحُ فِيهَا وَيُعْمَلُ عَلَى وَفْقِ ضَعِيفِهَا
‘ইমাম শাফিয়ি রহ. ও তার অনুসারীগণ উল্লিখিত (দুই ইদের রাত, জুমআর রাত, রজবের প্রথম রাত ও মধ্য শাবানের রাত ইত্যাদি) রাত্রি জাগরণকে মুসতাহাব বলেছেন; অথচ এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল। কারণ হলো, কিতাবের শুরুতে পূর্বেই গত হয়েছে যে, ফজিলত-সংক্রান্ত হাদিসসমূহের ক্ষেত্রে একটু শিথিলতা করা হয়ে থাকে এবং দুর্বল হাদিস অনুসারে আমল করার অবকাশ থাকে।’ (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ৫/৪৩, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)

হাফিজ ইবনে হাজার হাইসামি রহ. বলেন :
وَالْحَاصِلُ أَنَّ لِهَذِهِ اللَّيْلَةِ فَضْلًا وَأَنَّهُ يَقَعُ فِيهَا مَغْفِرَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَاسْتِجَابَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَمِنْ ثَمَّ قَالَ الشَّافِعِيُّ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِيهَا.
‘সারকথা হলো, শবে বরাতের ফজিলত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এ রাতে বিশেষভাবে ক্ষমা করা হয় এবং বিশেষভাবে দুআ কবুল করা হয়। এ ভিত্তিতেই ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেছেন, এ রাতে দুআ করা মুসতাহাব।’ (আল-ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কুবরা : ২/৮০, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যা)

আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি রহ. মুনইয়াতুল মুসল্লি গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে বলেন :
وَمِنْ الْمَنْدُوبَاتِ إحْيَاءُ لَيَالِي الْعَشْرِ مِنْ رَمَضَانَ وَلَيْلَتَيْ الْعِيدَيْنِ وَلَيَالِي عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ وَلَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ كَمَا وَرَدَتْ بِهِ الْأَحَادِيثُ.
‘রমজানের (শেষ) দশ রাত, দুই ইদের রাত, জিলহজের (প্রথম) দশ রাত ও মধ্য শাবানের রাত্রি জাগরণ মুসতাহাব ও উত্তম; যেমনটি হাদিসসমূহে এসেছে।’ (আল-বাহরুর রায়িক : ২/৫৬, প্রকাশনী : দারুল কিতাবিল ইসলামি, বৈরুত)

মূলত এখানে আরও অনেক সালাফের নাম উল্লেখ করা যেত। কিন্তু এভাবে লিস্ট করলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। যে দলিলগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, হকপ্রত্যাশীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। মোটকথা, শবে বরাতে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি না বানিয়ে, নামাজের বিশেষ কোনো রাকআত-সংখ্যা বা নিয়ম তৈরি না করে, দলবদ্ধভাবে বা মসজিদে জমায়েত না হয়ে এককভাবে ঘরে কিছু নফল ইবাদত-বন্দেগি করার বিষয়টি হাদিস, সালাফের আমল ও ফুকাহায়ে কিরামের ফতোয়া থেকে প্রমাণিত। আর এটা যেহেতু নফল ও মুসতাহাব একটি বিষয়, তাই এ নিয়ে কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আমলকারীরাও বিপরীত মতের লোকদের কটাক্ষ করবে না এবং আমল থেকে নিবৃত্ত থাকা ব্যক্তিরাও আমলকারীদের বিষয়ে কোনো কটু কথা বলতে পারবে না। এভাবে উভয় পক্ষ শান্ত থেকে কাজ করলে তবেই হবে তা শরয়ি দাবি ও তাকাজার বাস্তবায়ন। তা না করে উভয় পক্ষের যারাই এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, মুসতাহাবকে ফরজ মনে করবে কিংবা শরিয়া-অনুমোদিত কাজকে বিদআত বলে হাঙ্গামা করে, এরা সবাই মূলত প্রান্তিকতার শিকার। অতএব, সবাইকে এ বিষয়ে সংযত থাকতে হবে।

তৃতীয় অধ্যায় : শবে বরাতের পরের দিন রোজা

শবে বরাতের আমল ও ইবাদত নিয়ে যেমন ইখতিলাফ আছে, তেমনই এর রোজা নিয়েও বেশ তর্ক-বিতর্ক আছে। কেউ এদিনে রোজা রাখাকে সুন্নাত বা মুসতাহাব বলেন, কেউ জায়িজ বলেন, আর কেউ বিদআত বলেন। বস্তুত এ তর্ক-বিতর্ক অনেকটাই থেমে যাবে; যদি আমরা সত্যিকার বুঝার নিয়তে এসংক্রান্ত হাদিসটির অবস্থা যাচাই করে দেখি। কেননা, যারা এদিনে রোজা রাখার পক্ষে, তাদের ভিত্তি বা দলিল হলো ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত একটি হাদিস। হাদিসটি যদি সহিহ বা হাসান বা ন্যূনতম সাধারণ পর্যায়ের জইফও হতো, তাহলে এ থেকে সুন্নাত প্রমাণ না করা গেলেও কমপক্ষে মুসতাহাব বা জায়িজ অবশ্যই প্রমাণ করা যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, হাদিসটি নিতান্তই জইফ ও মারাত্মক দুর্বল। আর মুহাদ্দিসিনে কিরামের মূলনীতি অনুসারে মারাত্মক দুর্বল হাদিস কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়; চাই তা আকায়িদের ক্ষেত্রে হোক, আহকামের ক্ষেত্রে হোক কিংবা ফাজায়িলের ক্ষেত্রে হোক।

অনেকে হাদিসটিকে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল আখ্যা দিয়ে শবে বরাতের রোজাকে সাব্যস্ত করতে চান; অথচ তাদের এ প্রচেষ্টা সঠিক নয়। কেননা, তারা ভালো করে যাচাই করে দেখেননি যে, হাদিসটি সামান্য দুর্বল নাকি মারাত্মক দুর্বল। আমরা এখানে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখাব যে, হাদিসটি মারাত্মক দুর্বল, যা শরিয়তের কোনো ক্ষেত্রেই বিবেচনার উপযুক্ত নয়। প্রথমত আমরা সনদসহ হাদিসটি উল্লেখ কর। এরপর ইনশাআল্লাহ এর সনদগত মান নিয়ে কথা বলব।

সুনানে ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হয়েছে :
حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْخَلَّالُ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ أَبِي سَبْرَةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا
‘আলি বিন আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত) আসে তখন তোমরা রাতে নামাজ পড়ো এবং দিনে রোজা রাখো।’ (সুনানু ইবনি মাজাহ : ১/৪৪৪, হা. নং ১৩৮৮প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যি)

মূল আলোচনার পূর্বে প্রসঙ্গত বলে রাখি যে, কোনো হাদিসের সনদে যদি একজন বর্ণনাকারীও মিথ্যুক থাকে, তাহলে সেটা মওজু বা জাল হিসেবে বিবেচিত হয়; যদিও বাকি সব বর্ণনাকারী হাদিসশাস্ত্রের ইমামই হোন না কেন। অনুরূপভাবে কোনো একজন বর্ণনাকারী যদি পরিত্যাক্ত হয় বা বেশি ভুলকারী হয় তাহলে সেটা মওজু না হলেও মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল বলে গণ্য হয়। অর্থাৎ একজন বর্ণনাকারীর সমস্যাই পুরো সনদকে সমস্যাযুক্ত করে দেয়। আরেকটি বিষয় হলো, কোনো হাদিস একাধিক কিতাবে বা একাধিক সনদে বর্ণিত হলেই তা সহিহ বা হাসান পর্যায়ে উন্নীত হয়ে প্রমাণযোগ্য হয়ে যায় না। সনদে কোনো বর্ণনাকারীর ব্যাপারে সমস্যা থাকলে প্রথমে যাচাই করে দেখতে হবে যে, তার সমস্যা কোন পর্যায়ের। এরপর দেখতে হবে, এ হাদিসটির ভাষ্য অন্য কোনো সনদে বর্ণিত হয়েছে কিনা। যদি অন্য কোনো সনদে বর্ণিত না হয়ে থাকে, তাহলে উক্ত বর্ণনাকারীর সমস্যার ধরন অনুসারে হাদিসের ওপর হুকুম লাগানো হবে। যদি সে মিথ্যুক বর্ণনাকারী হয়ে থাকে, তাহলে হাদিসটি মওজু, পরিত্যাক্ত বর্ণনাকারী হলে মারাত্মক দুর্বল আর মাঝেমধ্যে ভুলকারী হলে বা স্মরণশক্তি কম হলে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল বলে বিবেচিত হবে। আর যদি তার আরও এক বা একাধিক সনদ থাকে, তাহলে দেখতে হবে এই সনদে যে বর্ণনাকারী আছে, সে অন্যান্য সনদের মধ্যেও আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে এমন একাধিক সনদের দ্বারা কোনো লাভ হবে না। এমন হাজার সনদ থাকলেও হাদিসটির মান ওই বর্ণনাকারীর অবস্থানুসারেই হবে। আর যদি অন্যান্য সনদে তার নাম না থাকে; বরং তার জায়গায় অন্য একজন শক্তিশালী বা সামান্য দুর্বল পর্যায়ের বর্ণনাকারী থাকে, তাহলেই কেবল সব সনদের অবস্থা বিবেচনা করে হাদিসটি কখনো হাসান এবং কখনো সহিহ’র মানে উত্তীর্ণ হয়। তৃতীয় আরেকটি বিষয় হলো, কোথাও জইফ বা দুর্বল বলা হলে সেটা সামান্য দুর্বল হওয়াকে আবশ্যক করে না; বরং এটা ব্যাপক একটি শব্দ। এটা যেমন সাধারণ পর্যায়ের দুর্বলকে অন্তর্ভুক্ত করে, ঠিক তেমনই মারাত্মক দুর্বলকেও শামিল করে। তাই কোথাও কেউ ‘দুর্বল’ শব্দ বললেই তা থেকে নিশ্চিতভাবে এটা বুঝার সুযোগ নেই যে, এখানে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল উদ্দেশ্য। বরং অবস্থা ও অন্যান্য দিক বিবেচনা করে তবেই বলা যাবে যে, এখানে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল বলা হয়েছে নাকি মারাত্মক দুর্বল বলা হয়েছে। এ তিনটি কথা মনে রাখলে সামনের আলোচনা বুঝতে সহজ হবে।

এখন আমরা প্রথমে দেখব, এ হাদিসটির সনদে কোনো বর্ণনাকারীর সমস্যা আছে কিনা। যাচাই করার পর দেখা গেল, হ্যাঁ, এতে ‘ইবনে আবি সাবরা’ নামক একজন বর্ণনাকারী আছে, যার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ খুবই কঠিন মন্তব্য করেছেন। তার ব্যাপারে আমরা হাদিসশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ ইমামদের মন্তব্য দেখি, তারা কী বলেন :
১. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, ‘সে জাল হাদিস তৈরি করত।’ (আল-জারহু ওয়াত-তাদিল : ৭/৩০৬, রাবি নং ১৬৬১, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি ইবনে আবি সাবরাকে মিথ্যুক বলেছেন।’ (কিতাবুল মাজরুহিন, ইবনু হিব্বান : ৩/১৪৭, রাবি নং ১২৫৬, প্রকাশনী : দারুল ওয়ায়ি, হালব)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, ‘তার হাদিসের কোনো ভিত্তি নেই। সে হাদিস জাল করে এবং মিথ্যা বলে।’ (আল-কামিল, ইবনু আদি : ৯/১৯৮, রাবি নং ২২০০, প্রকাশনী : আল-কুতুবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
২. ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ. বলেন, ‘তার হাদিসের কোনো ভিত্তি নেই।’ (প্রাগুক্ত)
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।’ (তারিখু বাগদাদ : ১৪/৩৭৩, রাবি নং ৭৬৯৭, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৩. ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, ‘নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের থেকে সে জাল হাদিস হাদিস বর্ণনা করত। তার হাদিস লেখা ও তদ্বারা দলিল দেওয়া বৈধ নয়।’ (কিতাবুল মাজরুহিন, ইবনু হিব্বান : ৩/১৪৭, রাবি নং ১২৫৬, প্রকাশনী : দারুল ওয়ায়ি, হালব)
৪. ইমাম হাকিম রহ. বলেন, ‘হিশাম বিন উরওয়া রহ. ও এমন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের থেকে সে জালভাবে হাদিস বর্ণনা করত।’ (তাহজিবুত তাহজিব : ১২/২৮, রাবি নং ১৩৮, প্রকাশনী : মাতবাআতুদ দায়িরাতিল মাআরিফিন্নিজামিয়্যা, ভারত)
৫. ইমাম সাজি রহ. বলেন, ‘তার অনেক মুনকার হাদিস রয়েছে।’ (প্রাগুক্ত)
৬. ইমাম বুখারি রহ. বলেন, ‘সে মুনকার (প্রত্যাখ্যাত) বর্ণনাকারী।’ (আল-কামিল, ইবনু আদি : ৯/১৯৮, রাবি নং ২২০০, প্রকাশনী : আল-কুতুবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭. ইমাম নাসায়ি রহ. বলেন, ‘সে মাতরুক (পরিত্যাক্ত) বর্ণনাকারী।’ (প্রাগুক্ত)
৮. ইমাম আলি বিন আলি মাদিনি রহ. বলেন, ‘সে মুনকার (প্রত্যাখ্যাত) বর্ণনাকারী ছিল।’ (তারিখু বাগদাদ : ১৪/৩৭৩, রাবি নং ৭৬৯৭, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৯. ইমাম ইবনে আদি রহ. বলেন, ‘তার অধিকাংশ বর্ণনা অরক্ষিত। সে ওই সকল বর্ণনাকারীদের অন্তর্গত, যারা জাল হাদিস তৈরি করে।’ (আল-কামিল, ইবনু আদি : ৯/২০২, রাবি নং ২২০০, প্রকাশনী : আল-কুতুবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১০. ইমাম ইয়াকুব বিন সুফইয়ান রহ. ‘যাদের সূত্রে হাদিস বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে’ অধ্যায়ে তার নাম উল্লেখ করেছেন। (আল-মারিফাতু ওয়াত-তারিখ : ৩/৪০, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
১১. হাফিজ জাহাবি রহ. বলেন, ‘সে মাতরুক (পরিত্যাক্ত) বর্ণনাকারী।’ (আল-কাশিফ : ২/৪১১, রাবি নং ৬৫২৫, প্রকাশনী : দারুল কিবলা, জিদ্দা)
১২. হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, ‘মুহাদ্দিসে কিরামের মতানুসারে সে মুত্তাহাম বিল-ওজা বা হাদিস জাল করার অভিযোগে অভিযুক্ত।’ (তাকরিবুত তাহজিব : পৃ. নং ৬২৩, রাবি নং ৭৯৬৭, প্রকাশনী : দারুর রশিদ, সিরিয়া)

এঁদের মন্তব্য থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায়, হাদিসের ক্ষেত্রে তার অবস্থা কেমন। অনেক ইমাম তো তার ব্যাপারে হাদিস জাল করার অভিযোগ করেছেন। এ হিসেবে তার বর্ণিত হাদিস জাল হওয়ার কথা। তবে অন্যান্য ইমামদের কথার সাথে সমন্বয় করে আমরা যে তাকে ন্যূনতম মারাত্মক দুর্বল রাবি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। অর্থাৎ সে একজন মাতরুক (পরিত্যাক্ত) বর্ণনাকারী, যার বর্ণিত হাদিস মারাত্মক দুর্বল হয়, যদ্দ্বারা শরিয়তের কোনো আমলই প্রমাণিত হয় না।

উল্লেখ্য যে, ‘ইবনে আবি সাবরা’ নামক রাবিকে হাফিজ জাহাবি রহ. ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’গ্রন্থে স্মৃতিশক্তি দুর্বল থাকার কারণে জইফ বলেছেন। তার এ মন্তব্যকে মূল ধরে অনেকে এ রাবিকে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল রাবি আখ্যা দিয়ে হাদিসটিকে সাধারণ দুর্বল বলার চেষ্টা করেছেন। অথচ হাফিজ জাহাবি রহ. স্বয়ং নিজেই তাঁর ‘আল-কাশিফ’ গ্রন্থে তাকে মাতরুক (পরিত্যক্ত) রাবি বলে আখ্যায়িত করেছেন; তাঁর এ বক্তব্যের কথা তারা বেমালুম চেপে যান কিংবা তাদের নজরে পড়েনি। ‘আল-কাশিফ’ হলো রিজালের ক্ষেত্রে জাহাবি রহ.-এর ফতোয়ার কিতাবের মতো। কিন্তু তারা হাফিজ জাহাবি রহ.-এর ‘আল-কাশিফ’-এর বক্তব্য উল্লেখ না করে শুধু ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’-তে উদ্ধৃত বক্তব্য উল্লেখ করে ইবনে আবি সাবরাকে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল রাবি প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন। অথচ এদিকে আমরা দেখলাম, ইমাম আহমাদ রহ., ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ., ইমাম ইবনে আদি রহ., ইমাম ইবনে হিব্বান রহ., ইমাম হাকিম রহ.-সহ প্রমূখ হাদিসশাস্ত্রের সম্রাটগণ তার ব্যাপারে হাদিস জাল করা ও মিথ্যা বলার কথা বলেছেন। পাশাপাশি ইমাম বুখারি রহ. ও ইবনে মাদিনি রহ. তাকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন। ইমাম ইমাম নাসায়ি রহ. তাকে ‘মাতরুকুল হাদিস’ বলেছেন। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাকে ‘মুত্তাহাম বিল-বিল-অজা’ বা হাদিস জাল করার অভিযোগে অভিযুক্ত বলেছেন। এতগুলো ইমামের এমন মারাত্মক ও কঠিন সব মন্তব্য থাকার পরও কি হাফিজ জাহাবি রহ.-এর অস্পষ্ট একটি মন্তব্যকে মুল ধরে তাকে সাধারণ পর্যায়ের দুর্বল রাবি বলার সুযোগ আছে? অথচ জাহাবি রহ.-এর উক্ত অস্পষ্ট ভাষ্যের বিপরীতে তার স্পষ্ট ভাষ্য তাঁর অন্য কিতাবে পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ আছে।

আমরা পূর্বে বলে এসেছি যে, শুধু ‘দুর্বল’ শব্দ বলার দ্বারা সামান্য দুর্বল প্রমাণ হয় না; বরং শব্দটি যেমন সামান্য দুর্বলকে অন্তর্ভুক্ত করে, ঠিক তেমনই তা অত্যধিক দুর্বলকেও শামিল করে। অতএব, হাফিজ জাহাবি রহ. কর্তৃক ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’-তে তাকে ‘দুর্বল’ বলার দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না যে, তিনি তাকে সামান্য দুর্বল বলেছেন। অন্যথায় যদি তিনি ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে ‘দুর্বল’ বলে সামান্য দুর্বলই বুঝাতেন, তাহলে ‘আল-কাশিফ’-এ তাকে কখনোই ‘মাতরুক’ (পরিত্যক্ত) রাবি বলে অভিহিত করতেন না। আর তিনি যে বলেছেন, মেধাগত দুর্বলতার কারণে তাকে জইফ বলা হয়েছে, এটাও তার সামান্য দুর্বল হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। কেননা, উলুমুল হাদিসের পরিভাষায় মেধাগত দুর্বলতাও দু’প্রকারের। এক : অল্প দুর্বলতা, যদ্দরুন মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যায়। এমন বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সামান্য দুর্বল বলে বিবেচিত হয়। দুই : অধিক দুর্বলতা, যদ্দরুন তার প্রচুর ভুল ঘটে। এমন রাবি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্বল বলে গণ্য হয়। তাই হাফিজ জাহাবি রহ.-এর ‘মেধাগত কারণে তাকে দুর্বল বলা হয়েছে’ বক্তব্যটিও তাকে সামান্য দুর্বল সাব্যস্ত করে না। সুতরাং ‘আল-কাশিফ’-এ তাঁর প্রদত্ত সিদ্ধান্তের সাথে এ বক্তব্যের কোনোই সাংঘর্ষিকতা নেই। কেননা, দুর্বল শব্দটি আম (ব্যাপক), আর ‘মাতরুক’ (পরিত্যাক্ত) শব্দটি খাস (বিশেষিত)। অতএব, যাকে ‘মাতরুক’ বলা যায়, তাকে ব্যাপকতার ভিত্তিতে দুর্বলও বলা যায়। কিন্তু যাকে সামান্য দুর্বল বলা হয়, তাকে কোনো অর্থেই ‘মাতরুক’ বলা যায় না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, উলুমুল হাদিসের নীতিমালা ভেঙে আরেকদল লোক ইবনে আবি সাবরাকে ইমাম সাব্যস্ত করার চেষ্টা করছে এবং তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেখা যাচ্ছে। শবে বরাতের রোজাকে প্রমাণ করার জন্য এমন তাহরিফেরও আশ্রয় নিতে হবে!!! বাস্তবতা হলো, ইবনে আবি সাবরা কাজি (বিচারক) ছিলেন। কেউ কেউ তাকে মুফতি ও ফকিহও বলেছেন। কিন্তু আহলে ইলমদের অজানা নয় যে, হাদিসশাস্ত্র সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। অন্য শাস্ত্রের অনেক বড় বড় ইমামও অনেক সময় হাদিসের ক্ষেত্রে এসে ‘মাতরুক’ (পরিত্যাক্ত) হিসেবে বিবেচিত হন। ইমাম ওয়াকিদি রহ.-এর কথাই ধরুন না! কত বড় জলিলুল কদর ইমাম! মাগাজি, তারিখ ও সিরাতের ক্ষেত্রে যাকে বাদ দিয়ে কোনো কিছুর কল্পনাই করা যায় না; অথচ মুহাদ্দিসিনে কিরাম তাকে হাদিসের ক্ষেত্রে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করেছেন! এখন তিনি মাগাজি, তারিখ ও সিরাতশাস্ত্রের ইমাম হওয়ার সুবাদে কেউ যদি তার ব্যাপারে অন্যদের বলা প্রশংসামূলক কিছু উদ্ধৃতি নিয়ে এসে তাকে হাদিসের জগতে নির্ভরযোগ্য রাবি হিসাবে প্রমাণ করতে চায়, তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে তাকে খিয়ানতকারী বলা হবে। ইবনে আবি সাবরার বিষয়টিও ঠিক এমনই। সে বিচার ও কাজার ক্ষেত্রে দক্ষ হওয়ার দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না যে, হাদিসশাস্ত্রে সে উল্লেখযোগ্য বা নির্ভরযোগ্য কেউ ছিল। বরং এখানে মুহাদ্দিসদের মন্তব্য ও অভিমত দেখতে হবে। তারা রাবির ব্যাপারে যে ফয়সালা করবেন, সেটাই চূড়ান্ত। এসব ক্ষেত্রে নিজের মনমতো ব্যাখ্যা দিয়ে কিছু প্রমাণ করা যাবে না।

কেউ কেউ এমনও বলতে চান যে, হাফিজ জাহাবি রহ. ইবনে আবি সাবরাকে দুর্বল বলে তার কারণ উল্লেখ করেছেন যে, তার মেধাগত দুর্বলতা ছিল। অতএব, তাঁর কথা যেহেতু মুফাসসাল তথা ব্যাখ্যা ও কারণসংবলিত, বিধায় অন্য ইমামদের কারণ বর্ণনা ছাড়া ইজমালিভাবে শুধু পরিত্যাক্ত বা মুনকার রাবি বলা গ্রহণযোগ্য নয়!!! আমি কথাটি শুনে মারাত্মক শক্ড হয়েছি! এটাও কোনো কথা হলো! আল্লাহ হিফাজত করুন ও তাদের ক্ষমা করুন। প্রথমত, তাদের কথানুসারে হাফিজ জাহাবি রহ.-এর নিজের কথারই তো কোনো মূল্য থাকল না। কারণ, তাদের ব্যাখ্যানুসারে হাফিজ জাহাবি রহ. যদি মেধাগত দুর্বলতার কারণে তাকে সামান্য জইফ বলে থাকেন, তাহলে তিনিই আবার ‘আল-কাশিফ’-এ তাকে ‘মাতরুক’ (পরিত্যাক্ত) বলা পাগলামি বা অজ্ঞতা ছাড়া আর কী বলা হবে!!! আসলে এটা কি জাহাবি রহ.-এর অজ্ঞতা নাকি আমাদের বুঝ ও সমন্বয়ের কমতি? কিছু পূর্বে বিষয়টি ক্লিয়ার করেছি যে, হাফিজ জাহাবি রহ.-এর কথার মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই, মূল সমস্যা হলো রুসুম প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদের তাহরিফের মানসিকতার। দ্বিতীয়ত, আসলেই কি অন্য ইমামদের কথা ইজমালি (ব্যাখ্যাবিহীন)? নাকি তাঁরাও তার পরিত্যাক্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন? ইমাম আহমাদ রহ., ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ., ইমাম ইবনে হিব্বান রহ., ইমাম হাকিম রহ., ইমাম ইবনে আদি রহ. প্রমূখ জরাহ-তাদিলের ইমামগণ যে বললেন, সে হাদিস জাল করত, মিথ্যা বলত এবং নির্ভরযোগ্য রাবিদের নাম ভাঙিয়ে তাদের থেকে এসব হাদিস প্রচার করত, এটা কি মুফাসসাল জরাহ (কারণ উল্লেখপূর্বক নিন্দাজ্ঞাপন) নয়? তৃতীয়ত, হাফিজ জাহাবি রহ.-এর উক্ত কথা কি আসলেই নিশ্চিত ব্যাখ্যা করে যে, সে সামান্য দুর্বল রাবি? কেননা, পূর্বে বলে এসেছি যে, মেধাগত দুর্বলতাও দু’প্রকারের। অধিক দুর্বলতা ও কম দুর্বলতা। হাফিজ জাহাবি রহ. তো আর এ কথা বলেননি যে, তার সামান্য দুর্বলতা ছিল, যদ্দরুন মাঝেমধ্যে ভুল করত! তাহলে এমন অস্পষ্ট একটি কথা দিয়ে তাবৎ ইমামদের কথাকে অগ্রাহ্য করার হেতু কী? চতুর্থত, হাফিজ জাহাবি রহ. যদি প্রকৃত অর্থেও তাকে সামান্য দুর্বল বলতেন, তবুও কি সকল ইমামের মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত ছুড়ে ফেলে দিয়ে তার কথা নেওয়া বৈধ হতো? যেখানে হাফিজ জাহাবি রহ. স্বয়ং নিজেই তাকে সামান্য দুর্বল মনে করেন না; যেমনটি ‘আল কাশিফ’-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, তাহলে এসব বলে কী প্রমাণ করা হচ্ছে? এটাই কি সহিহ তাহকিকের মানদণ্ড?! আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করুন।

সারকথা দাঁড়াল, ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হাদিসটি মওজু না হলেও কমপক্ষে মারাত্মক দুর্বল অবশ্যই। এতে কারও সন্দেহ করার সুযোগ বা অধিকার কোনোটিই নেই। এমন হাদিস না আকায়িদের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, না মাসায়িলের ক্ষেত্রে আর না ফাজায়িলের ক্ষেত্রে। অতএব, এ হাদিস দ্বারা শবে বরাতের বিশেষ রোজা সাব্যস্ত করার কোনোই অবকাশ নেই।

বাকি থেকে যায়, এ হাদিসটির কি আরও একাধিক সনদ আছে, যেখানে এ ইবনে আবি সাবরা নামক বিতর্কিত বর্ণনাকারী নেই? উত্তর হলো, না, এসংক্রান্ত এমন কোনো হাদিস পাওয়া যায় না, যে হাদিসের সনদে এ বর্ণনাকারী নেই। অতএব, একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ার সুবাদে এ হাদিসটিকে কোনোরকমে আমলযোগ্য বানানোর পথও একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল!

এ হাদিসটির ব্যাপারে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ শাইখ আলবানি রহ. বলেন :
قلت: وهذا إسناد مجمع على ضعفه، وهو عندي موضوع؛ لأن ابن أبي سبرة رموه بالوضع كما في التقريب. وقال البوصيري في الزوائد: إسناده ضعيف لضعف ابن أبي سبرة، واسمه أبو بكر بن عبد الله بن محمد بن أبي سبرة. قال فيه أحمد بن حنبل وابن معين: يضع الحديث
‘আমি বলি, এর সনদ সবার ঐকমত্যে দুর্বল। আমার দৃষ্টিতে এর সনদ মওজু বা জাল। কেননা, এতে ইবনে আবি সাবরা নামক একজন রাবিকে মুহাদ্দিসিনে কিরাম হাদিস জালকারী বলে অভিযুক্ত করেছেন; যেমন ‘তাকরিবুত তাহজিব’-এ বলা হয়েছে। হাফিজ বুওয়াইসিরি রহ. স্বীয় ‘জাওয়ায়িদ’-এ বলেন, ইবনে আবি সাবরা নামক একজন রাবি দুর্বল থাকায় এর সনদ দুর্বল। তার নাম আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ কুরাশি। তার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. ও ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ. বলেন, সে জাল হাদিস তৈরি করত।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জইফা : ৫/১৫৪, হা. নং ২১৩২, প্রকাশনী : দারুল মাআরিফ, রিয়াদ)

এ হাদিসটির ব্যাপারে শাইখ আলবানি রহ.-এর মন্তব্য নিয়ে অনেকে বিরূপ ও কটুবাক্য ব্যবহার করেছেন। অথচ এখানে তার বক্তব্য খুবই পরিষ্কার ও দলিলনির্ভর ছিল। তবুও নানা কারণে কেউ কেউ তার মত মানতে চান না। তাই এবার আমরা এ হাদিসটির ব্যাপারে আলবানি রহ. ছাড়াও প্রথিতযশা অন্য আরও কয়েকজন মুহাদ্দিসের মন্তব্য উল্লেখ করছি।

সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে বিদগ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদিস বিশারদ শুআইব আরনাউত রহ. বলেন :
إسناده تالف بمرة، ابن أبي سبرة وهو أبو بكر بن عبد الله بن محمَّد القرشي رموه بالوضع.
‘এর সনদ একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত তথা জাল। এতে ইবনে আবি সাবরা নামে একজন রাবি আছে, যার নাম আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ কুরাশি। মুহাদ্দিসিনে কিরাম তাকে হাদিস জালকারী বলে অভিযুক্ত করেছেন।’ (আত-তালিক আলা সুনানি ইবনি মাজাহ : ২/৩৯৯, হা. নং ১৩৮৮, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)

বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশেষজ্ঞ শাইখ বাশশার আওয়াদ মারুফ হাফি. বলেন :
وهذا سند ضعيف جدا، بل موضوع، من أجل ابن أَبي سبرة، واسمه أبو بكر بن عَبد الله بن محمد بن أَبي سبرة، فقد قال فيه أحمد بن حنبل وابن مَعِين: يضع الحديث.
‘এতে ইবনে আবি সাবরা নামে একজন রাবি থাকায় এটা মারাত্মক দুর্বল সনদ; বরং মওজু (জাল)। তার নাম হলো, আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবি সাবরা। তার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. ও ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ. বলেন, সে জাল হাদিস তৈরি করত।’ (আত-তালিক আলা তাহজিবিল কামাল : ২/৯৪, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)

নিকট অতীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ. বলেন :
والصواب أنه موضوع، فإن في إسناده أبا بكر عبد الله بن محمد، المعروف بابن أبي سبرة، قال فيه الإمام أحمد ويحيى بن معين: إنه كان يضع الحديث.
‘সঠিক কথা হলো, এটা মওজু হাদিস। কেননা, এর সনদে ইবনে আবি সাবরা নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে, যার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রহ. ও ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন রহ. বলেছেন যে, সে হাদিস জাল করত।’ (মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িলিল উসাইমিন : ২০/২৬, প্রকাশনী : দারুল ওয়াতন)

এই ছিল শবে বরাতের রোজার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটির হাকিকত। এমন মারাত্মক দুর্বল হাদিস নিয়েও যারা শবে বরাতের রোজা প্রমাণ করতে চান, তাদের ব্যাপারে আসলে কিছু বলার থাকে না। আমরা উসুলের আলোকে যা বাস্তব, সেটাই তুলে ধরলাম। বাকি সবাইকে মানানোর দায়িত্ব আমাদের নয়। যার ইচ্ছা হয় মানবে, আর যার ইচ্ছা না হয় মানবে না। তবে ইদানিং আরেক শ্রেণির লোক দেখছি, যারা মারাত্মক দুর্বল হাদিসকেও ফাজায়িলের ক্ষেত্রে আমলযোগ্য মনে করে। তাদের বক্তব্য হলো, যে বর্ণনাকারী অত্যধিক মেধাগত দুর্বলতার কারণে জইফে শাদিদ বা মারাত্মক দুর্বল হবে, তার বর্ণিত হাদিস ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে। অতএব, জাহাবি রহ.-এর বক্তব্যানুসারে ইবনে আবি সাবরা যেহেতু মেধাগত কারণে মারাত্মক দুর্বল রাবি, তাই ফজিলতের ক্ষেত্রে তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে। অথচ এমন উসুলের কথা অনুসরণীয় কোনো মুহাদ্দিসই বলেননি যে, অত্যধিক মেধাগত দুর্বলতার কারণে কেউ মারাত্মক দুর্বল হলে ফজিলতের ক্ষেত্রে তার বর্ণিত হাদিসের ওপর আমল করা যাবে। দ্বিতীয়ত, ইবনে আবি সাবরার শুধু মেধাগত দুর্বলতাই ছিল না; বরং নির্ভরযোগ্য রাবিদের থেকে ভুল ও মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করারও অভিযোগ আছে। তাই এ উদ্ভট উসুলের ভিত্তিতে তার বর্ণিত হাদিসকে ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য বলা চরম ভুল। জমহুরে মুহদ্দিসের বক্তব্য হলো, সামান্য দুর্বল হাদিস ফজিলতসংক্রান্ত আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হলেও মারাত্মক দুর্বল হাদিস কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে অসংখ্য ইমামের বক্তব্য আছে, যারা কোনোরূপ পার্থক্য করা ছাড়াই মারাত্মক দুর্বল হাদিসকে সকল ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।

আল্লামা আব্দুল হাই লাখনোবি রহ. বলেন :
وَأما الْعَمَل بالضعيف فِي فَضَائِل الْأَعْمَال فدعوى الِاتِّفَاق فِيهِ بَاطِلَة. نعم هُوَ مَذْهَب الْجُمْهُور لكنه مَشْرُوط بِأَن لَا يكون الحَدِيث ضَعِيفا شَدِيد الضعْف، فَإِذا كَانَ كَذَلِك لم يقبل فِي الْفَضَائِل أَيْضا
‘ফজিলতসংক্রান্ত আমলের ক্ষেত্রে জইফ হাদিসের ওপর আমল করার ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যের দাবি করা ভুল। হ্যাঁ, এটা জমহুরের মত ঠিক আছে, তবে শর্ত হলো, হাদিসটি অত্যধিক দুর্বল না হওয়া। কেননা, হাদিস যদি অত্যধিক দুর্বল হয়, তখন তা ফাজায়িলের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য নয়।’ (আল-আসারুল মারফুআ ফিল আখবারিল মাওজুআ : পৃ. নং ৮১, প্রকাশনী : মাকতাবাতুশ শারকিল জাদিদ, বাগদাদ)

কেউ কেউ আবার এটাকে অগ্রহণযোগ্য হাদিস মেনে নিলেও ভিন্ন পদ্ধতিতে শবে বরাতের রোজা প্রমাণ করতে চান। তাদের দলিল হলো, শবে বরাত শাবানের পনেরো তারিখে হওয়ায় তা যেহেতু আইয়ামে বিজের অন্তর্ভুক্ত, তাছাড়াও রাসুলুল্লাহ সা. শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন, বিধায় এ ভিত্তিতে শবে বরাতে রোজা রাখার প্রচলনটি সঠিক। কিন্তু এভাবে আইয়ামে বিজের রোজা ও শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখার হাদিসের ভিত্তিতে নির্দিষ্টভাবে শবে বরাতের পনেরো তারিখের রোজা রাখার বিষয়টি কতটুকু শরিয়াসম্মত? আদৌ কি এভাবে জোড়াতালি দিয়ে ইসলামে নতুন কোনো ইবাদত চালু করার অনুমতি আছে? কেননা, ইবাদত এমন এক সেন্সিটিভ বিষয়, যেখানে যুক্তি, কিয়াস ও অনুমানের ভিত্তিতে কোনো কিছু সাব্যস্ত হয় না। এসব ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট নস লাগে। অনুরূপ সাহাবায়ে কিরামের আমল বা কর্মপন্থাও দেখতে হয়। শুধু নিজের মনমতো কিছু হাদিসকে জোড়াতালি দিয়ে দিলেই কোনো ইবাদত প্রমাণিত হয়ে যায় না। যদি তা-ই হতো, তাহলে বিদআতিদের মিলাদ-কিয়ামও এভাবে বৈধ প্রমাণ করা যায়। যারা শবে বরাতের রোজাকে মুসতাহাব বা সুন্নাত প্রমাণ করার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তারা কি একজন সাহাবি থেকেও প্রমাণ করতে পারবেন যে, তিনি শবে বরাতের নামে আলাদা কোনো রোজা রেখেছেন? মনে রাখতে হবে, জোড়াতালি দিয়ে ও জোর করে অনেক কিছুই করা গেলেও ইসলামের নামে কোনো ইবাদত প্রমাণ করা যায় না। করলেও সেটাকে ইবাদত বলা হয় না; বরং সেটা হয়ে যায় বিদআত। ইতিহাস দেখলে বুঝা যায়, সকল বিদআত এভাবে জোর করে জোড়াতালি দিয়েই প্রমাণ করা হয়েছে। তাই ইবাদত-সংক্রান্ত মাসআলায় আমাদের খুবই সচেতন থাকতে হবে।
এ পর্যায়ে আমরা প্রথমে আইয়ামে বিজের রোজা ও শাবান মাসে অধিক রোজা রাখা-সংক্রান্ত সে হাদিসগুলো উল্লেখ করব। এরপর এর দলিলভিত্তিক জবাব পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

হাদিসগুলো হলো :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: أَوْصَانِي خَلِيلِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلاَثٍ: صِيَامِ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَيِ الضُّحَى، وَأَنْ أُوتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ
‘আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মাহবুব (রাসুলুল্লাহ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতি মাসে তিন দিন করে রোজা পালন করা, দু’রাকআত করে চাশতের নামাজ পড়া এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর আদায় করা।’ (সহিহুল বুখারি : ৩/৪১, হা. নং ১৯৮১, প্রকাশনী : দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)

عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَصُومَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ الْبِيضَ: ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ
‘আবু জার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের প্রত্যেক মাসের আইয়ামে বিজের তিনটি রোজা রাখতে বলেছেন। আইয়ামে বিজ হলো, মাসের তেরোতম, চোদ্দতম ও পনেরোতম দিন।’ (সুনানুন নাসায়ি : ৪/২২২, হা. নং ২৪২২, প্রকাশনী : মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব)

عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، قَالَ: سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، عَنْ صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: كَانَ يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ: قَدْ صَامَ وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ: قَدْ أَفْطَرَ، وَلَمْ أَرَهُ صَائِمًا مِنْ شَهْرٍ قَطُّ، أَكْثَرَ مِنْ صِيَامِهِ مِنْ شَعْبَانَ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ إِلَّا قَلِيلًا.
‘আবু সালামা রহ. বলেন, আমি আয়িশা রা.-কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি (কখনো এত বেশি) রোজা রাখতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি রোজা রেখেই যাচ্ছেন। আবার (কখনো এত বেশি) রোজাহীন অবস্থায় থাকতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি রোজাহীন অবস্থায়ই দিন পার করছেন। আমি তাঁকে শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনো মাসে এত অধিক রোজা রাখতে দেখিনি। তিনি শাবানের সামান্য কয়েকদিন ছাড়া পুরো মাসই রোজা রাখতেন।’ (সহিহু মুসলিম : ২/৮১১, হা. নং ১১৫৬, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

এ জাতীয় হাদিসগুলো সামনে রেখে কারও কারও অভিমত হলো, যেহেতু প্রত্যেক মাসের আইয়ামে বিজ তথা তেরো, চোদ্দো ও পনেরো তারিখের রোজা রাখা মুসতাহাব, তাছাড়াও শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা আলাদা একটি সুন্নাত; বিধায় শবে বরাত তথা শাবানের পনেরো তারিখের রোজার কথা আলাদাভাবে বর্ণিত না হলেও এ থেকে শবে বরাতের রোজা রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এর প্রতিউত্তরে বলব, মূলত শরয়ি উসুল বা মূলনীতির সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকার কারণেই এমন উদ্ভট ব্যাখ্যার মাধ্যমে শবে বরাতের রোজাকে সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শরিয়তের মূলনীতি হলো, কোনো ব্যাপক ইবাদতকে কোনো কিছুর সাথে নির্দিষ্ট করে নেওয়া বা নিঃশর্ত ইবাদতকে কোনো শর্তের সাথে যুক্ত করে নেওয়া বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, যা পরিপূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য।

ইমাম শাতিবি রহ. বিদআতের সংজ্ঞার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন :
وَمِنْهَا: الْتِزَامُ الْعِبَادَاتِ الْمُعَيَّنَةِ فِي أَوْقَاتٍ مُعَيَّنَةٍ لَمْ يُوجَدْ لَهَا ذَلِكَ التَّعْيِينُ فِي الشَّرِيعَةِ، كَالْتِزَامِ صِيَامِ يَوْمِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ.
‘বিদআত হওয়ার আরেকটি পদ্ধতি হলো, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদতকে বিশেষিত করে নেওয়া, শরিয়তে যে নির্দিষ্টকরণের কোনো প্রমাণ নেই। যেমন শবে বরাতের রোজাকে বিশেষিত করে নেওয়া।’ (আল-ইতিসাম : ১/৫৩, প্রকাশনী : দারু ইবনি আফফান, সৌদিআরব)

এটা পরিষ্কার যে, যারা শবে বরাতের রোজা রাখার পক্ষে, তারা এটাকে শবে বরাতের রোজা হিসাবেই রাখে, আইয়ামে বিজের রোজা বা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন, এ হিসেবে রাখে না। নতুবা অন্য কোনো মাসে বা শাবানের অন্যান্য দিনে রোজার কোনো খবর নেই; হঠাৎ করে শাবান মাসের পনেরো তারিখের রোজা নিয়ে এত গুরুত্বারোপের কারণ কী? এটা মূলত আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রোজার রুসুম ধরে রাখার প্রচেষ্ট বৈ কিছু নয়। একটু গভীরভাবে নিবিষ্ট মনে চিন্তা করলে নিজের অন্তরই এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। আর তাই আইয়ামে বিজের রোজার কথা বলা হলেও এদিনে মূলত আইয়ামে বিজের রোজার গুরুত্বের কারণে নয়; বরং শবে বরাতের কথা মাথায় রেখেই রোজা রাখা হয়। এজন্য সমাজে এটা ‘শবে বরাতের রোজা’ নামেই পরিচিত। তাছাড়াও আইয়ামে বিজের রোজা তো তিনটি; যথা তেরো, চোদ্দ ও পনেরো তারিখের রোজা। কিন্তু যারা শবে বরাতে রোজা রাখে তারা কি এভাবে তিনটি রোজা রাখে? তবে হ্যাঁ, যারা নিয়মিত প্রত্যেক মাসেই আইয়ামে বিজের রোজা রাখে অথবা শাবান মাসেই শবে বরাতের রোজার নিয়তে নয়; বরং সত্যিকারার্থে আইয়ামে বিজের নিয়তেই তিনটি রোজা রাখবে, তাদের কথা স্বতন্ত্র। তারা তো শুধু এখানে এসে রুসুম পালনকারীদের মতো শুধু একটি রোজা রাখেন না; বরং নিয়মমতো তিনটি রোজাই রাখেন। তাই তাদের রোজা রাখা সুন্নাহ হিসেবেই বিবেচিত হবে, বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

অতএব, যাদের সত্যিকারার্থে আইয়ামে বিজের রোজা রাখার অভ্যাস বা নিয়ত নেই, তাদের জন্য শবে বরাতকে উপলক্ষ্য করে হঠাৎ এ শাবান মাসে এভাবে রোজা রাখার কোনো মানে হয় না। এজন্যই পূর্বাভ্যাস ছাড়া ফুকাহায়ে কিরাম শাবান মাসের ত্রিশ তারিখের রোজাকে মাকরুহ বলেছেন। যেহেতু শাবানের ত্রিশ তারিখ রমজানের প্রথম তারিখ হওয়ার সম্ভাবনার ভিত্তিতে রোজার নিয়তের মধ্যে ফরজ ও নফল একসাথে মিক্স থাকার প্রবল সম্ভাবনা থাকে; বিশেষ করে যদি সে সাধারণ মানুষ হয়ে থাকে, যার নিয়তের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা নেই। এজন্যই এদিনে আগে থেকে রোজা রাখার অভ্যাস বা নিয়ম না থাকলে ভিন্নভাবে নফল রোজা রাখার অনুমতি নেই।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
فأما صوم يوم النصف مفردًا فلا أصل له، بل إفراده مكروه،
‘আর আলাদাভাবে শবে বরাতের একটি রোজা রাখার কোনো ভিত্তি নেই; বরং এভাবে এককভাবে শবে বরাতের রোজা রাখা মাকরুহ।’ (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম : ২/১৩৮, প্রকাশনী : দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)

এ থেকে প্রতীয়মান হলো যে, ‘শবে বরাতের রোজা’ নামে আমাদের দেশে যেটার প্রচলন আছে, তা সুন্নাহ-সমর্থিত নয়। এক কথায় বলা যায়, ‘শবে বরাতের রোজা’ নামে ইসলামে আলাদা ও বিশেষ কোনো রোজা নেই। কেউ শবে বরাতের নামে এভাবে রোজা রাখলে তা বিদআত হবে। কারও যদি আইয়ামে বিজের রোজা রাখার অভ্যাস বা ইচ্ছা থাকে, সেটা ভিন্ন বিষয়। এর সাথে শবে বরাতের রোজা গুলিয়ে ফেলে শবে বরাতে রোজা আছে সাব্যস্ত করা সঠিক সমঝের পরিচায়ক নয়। অনুরূপ কারও যদি সোমবার বা বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখার অভ্যাস থেকে থাকে এবং শাবানের পনেরো তারিখ সেদিনটির সাথে মিলে যায় তাহলেও এ হিসাবে তার জন্য রোজা ঠিক আছে। অনুরূপ হাদিসে শাবানে অধিক পরিমাণে রোজা রাখার কথা পাওয়া যায়। অতএব, দিন-তারিখ নির্দিষ্ট না করে শাবান মাসে যদি কেউ বেশি বেশি রোজা রাখে এবং এ রোজার ধারাবাহিকতায় পনেরো তারিখেও রোজা রাখে, তাহলেও সেটা ঠিক আছে। কেননা, সেটা শবে বরাতকে কেন্দ্র করে রোজা রাখা হচ্ছে না এবং তার নিয়তের মধ্যে শবে বরাতের রোজার কোনো ব্যাপারও নেই। এসব ছাড়া শুধু শবে বরাতকে উদ্দেশ্য করে বিশেষভাবে এদিনে রোজা রাখার প্রথাটি কিছুতেই শরিয়া-সমর্থিত নয়; বরং সমাজে শবে বরাতের নামে এ রোজার প্রচলন থাকায় এটা বিদআত বলেই পরিগণিত হবে। বাস্তব সমীক্ষা বলে, আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক এ দিনে শবে বরাতের রোজা হিসেবেই আলাদা একটি রোজা রেখে থাকে। তাই এ থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে এবং অন্যদেরও সতর্ক করতে হবে।

চতুর্থ অধ্যায় : শবে বরাতে করণীয় আমলসমূহ

পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা বিশেষ কোনো নিয়ম-পদ্ধতি নেই। তাই নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নির্ধারণ না করে সাধারণভাবে এ রাতে ঘরে বসে ব্যক্তিগতভাবে নফল নামাজ, তিলাওয়াত, দুআ-জিকির ও আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত।

আল্লামা শারামবুলালি রহ. বলেন :
ومعنى القيام أن يكون مشتغلا معظم الليل بطاعة وقيل بساعة منه يقرأ أو يسمع القرآن أو الحديث أو يسبح أو يصلي على النبي صلى الله عليه وسلم
‘রাত্রি জাগরণের তাৎপর্য হলো, রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়ে দেবে। কারও মতে এতে কিছু সময় কুরআন-হাদিস পড়বে ও শুনবে বা তাসবিহ পাঠ করবে বা দরুদ পাঠ করেবে।’ (মারাকিল ফালাহ শারহু নুরিল ইজাহ : পৃ. ১৫১, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত)

সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে :
نْ عَائِشَةَ قَالَتْ: فَقَدْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةً فَخَرَجْتُ، فَإِذَا هُوَ بِالبَقِيعِ، فَقَالَ: أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ.
‘আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বিছানায় পেলাম না। আমি (তাঁর সন্ধানে) বের হলাম। এসে দেখলাম, তিনি জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে আছেন। তিনি বললেন, তুমি কি ভয় করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার প্রতি কোনো অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি আপনার অন্য কোনো বিবির নিকটে গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানে (১৫ তারিখের রাতে) দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। তারপর কালব গোত্রের বকরির পালের লোমের চেয়েও বেশি সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন।’ সুনানুত তিরমিজি : ২/১০৮, হা. নং ৭৩৯, প্রকাশনী : দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত)

এ হাদিসটি জইফ তথা দুর্বল হলেও তা মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল না হওয়ায় ফজিলতপূর্ণ আমলের ক্ষেত্রে তা আমলযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
এ হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তাআলা এ রাতে অসংখ্য বনি আদমকে ক্ষমা করে দেন। তাই এ রাতে বেশি বেশি রোনাজারি করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। এছাড়াও এ হাদিস থেকে আরও জানা যায় যে, এ রাতে কবর জিয়ারত করা যায়। বিজ্ঞ ফুকাহায়ে কিরামের নিকট এ থেকে প্রত্যেক শবে বরাতেই কবর জিয়ারত সুন্নত বা মুসতাহাব সাব্যস্ত হয় না। কেননা, রাসুলুল্লাহ সা. থেকে এ ছাড়া আর কোনো শবে বরাতে কবর জিয়ারত প্রমাণিত নয়। অনুরূপ তাঁর সাহাবা থেকেও প্রমাণিত নয়। তাই সময় সুযোগ করে এ রাতে কখনোসখনো কবর জিয়ারত করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে বা আনুষ্ঠানিকভাবে বা অন্য কোনো বিশেষ নিয়মে গেলে তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। লক্ষ করুন, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতে কিন্তু গোপনেই কবর জিয়ারত করছিলেন; এমনকি তাঁর ঘরে থাকা আয়িশা রা.-ও ব্যাপারটি প্রথমে জানতে পারেননি। তাই দলবদ্ধভাবে ও একে অপরকে ডেকে এমনটা করা ঠিক হবে না। এছাড়াও এ রাতে সাধ্যমতো নামাজ, তিলাওয়াত ইত্যাদি করা যেতে পারে। তবে তা হতে হবে একাকি এবং সম্ভব হলে নিজ ঘরে। এর জন্য মসজিদে গিয়ে একত্রিত হয়ে রাত্রি জাগরণ করার অনুমতি নেই।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
وَأَمَّا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَفِيهَا فَضْلٌ، وَكَانَ فِي السَّلَفِ مَنْ يُصَلِّي فِيهَا، لَكِنَّ الِاجْتِمَاعَ فِيهَا لِإِحْيَائِهَا فِي الْمَسَاجِدِ بِدْعَةٌ
‘অবশ্য শবে বরাতের ব্যাপারে ফজিলতের কথা পাওয়া যায়। সালাফে সালেহিনের কেউ কেউ এ রাতে নামাজ পড়তেন। কিন্তু এ রাতকে জাগ্রত রাখার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়া বিদআত।’ (আল-ফাতাওয়াল কুবরা : ৫/৩৪৪, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে :
عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي عَمْرَةَ، قَالَ: دَخَلَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ الْمَسْجِدَ بَعْدَ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ، فَقَعَدَ وَحْدَهُ، فَقَعَدْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ، يَا ابْنَ أَخِي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ وَمَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُ
‘আব্দুর রহমান বিন আবু আমরা রহ. সমান বিন আফফান রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাআতে পড়ল সে যেন অর্ধ রাত পর্যন্ত নামাজ পড়ল। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাআতে পড়ল সে যেন পূর্ণ রাতই নামাজ পড়ল।’ (সহিহু মুসলিম : ১/৪৫৪, হা. নং ৬৫৬, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন :
أَنَّ إحْيَاءَ لَيْلَةِ الْعِيدِ أَنْ يُصَلِّيَ الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ وَيَعْزِمَ أَنْ يُصَلِّيَ الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ
‘ইদের রাত্রি জাগরণ এভাবে যে, ইশার নামাজ জামাআতে পড়বে এবং ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে পড়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করে রাখবে।’ (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ৫/৪৩, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)

উপরিউক্ত মারফু হাদিস ও সাহাবির উক্তি থেকে জানা গেল যে, ইশার নামাজ ও ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করলে সারা রাত ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়। যদিও এটা শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট নয়, তথাপি এখানে এ হাদিস এজন্যই উল্লেখ করা হলো যে, অনেকে আছে, যারা অনেক রাত পর্যন্ত ইবাদত করে শেষ রাতে ঘুমিয়ে যায় এবং ফজরের নামাজ কাজা হয়ে যায়। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত-বন্দেগি করে কমপক্ষে ফজরের নামাজটা জামাআতের সাথে পড়তে পারলে আমরা সারা রাতই ইবাদতের সাওয়াবের ভাগীদার হতে পারব। তাই দুর্বল ও অলস লোকদের জন্য এটা আমলের উত্তম ও সহজ একটি পন্থা হতে পারে।

এসব হাদিস, আসার ও ফুকাহায়ে কিরামের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারলাম, শবে বরাতে আমাদের জন্য নিম্নোক্ত আমলগুলো করা উচিত :
১. ইশার নামাজ জামাআতের সহিত আদায় করা।
২. সাধ্যমতো ঘরে একাকি নফল নামাজ পড়া।
৩. গভীর মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করা।
৪. দুআ ও রোনাজারির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৫. কখনোসখনো সম্ভব হলে একাকি কবর জিয়ারত করা।
৬. ফজরের নামাজ জামাআতের সহিত আদায় করা।

পঞ্চম অধ্যায় : শবে বরাতে বর্জনীয় কাজসমূহ

আমাদের সমাজে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অনেক রুসুম ও রেওয়াজ চালু আছে, যার কোনোটিই শরিয়াহ সমর্থিত নয়। আমাদের এসব প্রথা ও প্রচলন থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যেমন :

১. হালুয়া-মিষ্টি তৈরি করা।

শরিয়তে এর কোনোই ভিত্তি নেই। অনেকে মনে করেন, এদিন উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁত পড়ে গেলে তিনি হালুয়া-মিষ্টি খেয়েছিলেন। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এর কোনো প্রমাণ নেই। কেননা, উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শাওয়াল মাসে। তাছাড়া দাঁত শহিদ হওয়ার পর তিনি যে হালুয়া-মিষ্টি খেয়েছিলেন, এরও কোনো ভিত্তি নেই। তাই এটা ইসলামের নামে একটি কুপ্রথা, যা আমাদের অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. বলেন :
شب برآت کی اتنی اصل ہے کہ پندرہویں رات اور پندرہواں دن اس مہینے کا بہت بزرگی اور برکات ہے ہمارے پیغمبر نے اس رات کو جاگنے کی اور دن کو روزہ رکھنے کی رغبت دلائی ہے، اور اس رات میں آپ نے مدینہ کی قبرستان جاکر مردوں کیلئے بخشش کی دعا مانگی ہے اس سے زیادہ جتنے بکھیڑے لوگ کررہے ہیں اس میں حلوے کی قید لگارکھی ہے اس طریقہ سے فاتحہ دلاتے ہیں اور خوب پابندی سے یہ کام کرتے ہیں یہ سب واہیات ہیں.
‘শবে বরাতের এতটুকু ভিত্তি আছে যে, এ মাসের পনেরো তারিখ দিবরাত্রি মহাসম্মানিত ও বরকতময়। আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাত জেগে ইবাদত করার এবং দিনে রোজা রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। (সতর্কতা : পূর্বে গত হয়েছে যে, রোজা রাখার হাদিসটি এতই দুর্বল, যা আমল করার অনুপোযোগী। তাই এটা আমলযোগ্য নয়।) এ রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এছাড়া লোকজন যত সব ধুমধাম করছে, এতে হালুয়া-মিষ্টি সংযুক্ত করছে, তেমনিভাবে ফাতিহার প্রবর্তন করছে এবং খুব গুরুত্ব সহকারে এসব করছে; এগুলো সব গর্হিত ও মনগড়া।’ (বেহেশতি জেওর : ৬/২৯৬, প্রকাশনী : তাওসিফ পাবলিকেশন, লাহোর)

২. ভালোভাবে গোসল করা। প্রচলিত আছে যে, এ রাতে ভালোভাবে গোসল করলে গোসলের সাথে সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে যায়।

এটাও সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি কথা। কুরআন-সুন্নাহয় এর কোনো ভিত্তি নেই। তাই এমন আকিদা-বিশ্বাস ও কর্ম থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকতে হবে। তবে হ্যাঁ, এমনিতেই গরম থেকে বাঁচার জন্য বা পাক-পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করতে কোনো বাধা নেই।

৩. বিশেষ পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট রাকআতে নামাজ পড়া।

এটাও ভিত্তিহীন একটি আমল। এ রাতে এমন বিশেষ কোনো নামাজ নেই। এমনিতেই নফল হিসাবে যা ইচ্ছা পড়তে পারবে, কিন্তু কোনো বিশেষ পদ্ধতি বা ধরণ যুক্ত করলে তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।

ইমাম নববি রহ. বলেন :
الصَّلَاةُ الْمَعْرُوفَةُ بصلاة الرغائب وهي ثنتى عَشْرَةَ رَكْعَةً تُصَلَّى بَيْنَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ لَيْلَةَ أَوَّلِ جُمُعَةٍ فِي رَجَبٍ وَصَلَاةُ لَيْلَةِ نِصْفِ شَعْبَانَ مِائَةُ رَكْعَةٍ وَهَاتَانِ الصَّلَاتَانِ بِدْعَتَانِ وَمُنْكَرَانِ قَبِيحَتَانِ
‘সালাতুর রাগায়িব নামে যে প্রসিদ্ধ নামাজ আছে, যা রজবের প্রথম জুমআয় মাগরিব ও ইশার নামাজের মাঝে বারো রাকআত করে পড়া হয়, অনুরূপ শবে বরাতের একশ রাকআত বিশেষ নামাজ; উভয়টিই বিদআত ও চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত।’ (আল মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ৪/৫৬, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)

৪. মৃতদের আত্মা বাড়িতে আসা এবং সবাইকে দেখে যাওয়া।

এটা মূলত হিন্দুদের আকিদা-বিশ্বাস। মৃত্যুর পর রুহ কখনো ফিরে আসে না। হয় সে ইল্লিয়্যিনে থাকে নয়তো সিজ্জিনে। বাড়িতে এভাবে আত্মা ফিরে আসার হিন্দুয়ানি আকিদা-বিশ্বাসের দ্বারা ইমানের ভয়ানক ক্ষতি হয়। তাই এমন বিশ্বাস অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَحَرَامٌ عَلَى قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا أَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
‘যেসব জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তার অধিবাসীদের ফিরে না আসা অবধারিত।’ (সুরা আল-আম্বিয়া : ৯৫)

শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ বলেন :
الإنسان إذا مات يغيب عن هذه الحياة ويصير إلى عالم آخر ، ولا تعود روحه إلى أهله ولا يشعرون بشيء عنه ، وما ذكر من عودة الروح لمدة أربعين يوما فهي من الخرافات التي لا أصل لها
‘মানুষ যখন মারা যায় তখন সে এ জগত থেকে পুরোপুরি বিদায় নিয়ে অন্য জগতে চলে যায়। তার রুহ পরিবারের কাছে ফিরে আসে না এবং তার পরিবারও এ সম্পর্কে কিছু অনুভব করতে পারে না। মৃত্যুর চল্লিশদিন পর রুহ ফিরে আসার যে কথা প্রচলিত আছে, তা পুরোই অনুমাননির্ভর, যার কোনো ভিত্তি নেই।’ (ইসলাম কিউএ ডট ইনফো : ফতোয়া নং ১৩১৮৩)

৫. মসজিদে বয়ান করা ও কাঁথা-কম্বল নিয়ে মসজিদে গিয়ে সবাই একসাথে রাত জাগা।

এটাও একটি বিদআতি আমল। নফল কাজে পরস্পরে ডাকাডাকি, গুরুত্বারোপ ও একত্রিত হওয়া জায়িজ নেই; বরং তা একাকি ও নির্জনে করা নিয়ম। তাই এসব কর্ম থেকেও বিরত থাকতে হবে।

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. বলেন :
والثاني انه يكره الاجتماع فيها في المساجد للصلاة و القصص و الدعاء ولا يكره ان يصلي الرجل فيها لخاصة نفسه و هذا قول الاوزعي امام اهل الشامي و فقيههم و عالمهم و هذا هو الاقرب ان شاء الله تعالى
‘আর দ্বিতীয় মত হলো, এ রাতে নামাজ, ওয়াজ ও দুআর জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়া মাকরুহ। তবে একাকি নিজে নিজে এ রাতে নামাজ পড়লে তা মাকরুহ হবে না। এটাই ইমাম আওজায়ি রহ.-এর মত, যিনি সিরিয়ার ইমাম, ফকিহ ও আলিম। আর এ মতটিই ইনশাআল্লাহ অধিক সঠিক।’ (লাতাইফুল মাআরিফ : পৃ. ১৩৭, প্রকাশনী : দারু ইবনি হাজাম)

মুল্লা আলি কারি রহ. আল্লামা তিবি রহ. থেকে নকল করে বলেন :
مَنْ أَصَرَّ عَلَى أَمْرٍ مَنْدُوبٍ، وَجَعَلَهُ عَزْمًا، وَلَمْ يَعْمَلْ بِالرُّخْصَةِ فَقَدْ أَصَابَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْإِضْلَالِ فَكَيْفَ مَنْ أَصَرَّ عَلَى بِدْعَةٍ أَوْ مُنْكَرٍ؟
‘যে ব্যক্তি মুসতাহাব কাজে বাড়াবাড়ি করবে এবং এটাকে এমনভাবে আবশ্যক করে নেবে যে, রুখসতের ওপর আমলই করে না, তাহলে তাকে শয়তান গোমরাহিতে নিপতিত করেছে। তাহলে যে ব্যক্তি কোনো বিদআত বা শরিয়া পরিপন্থী কাজের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে, তার ব্যাপারটি কত ভয়াবহ?! (মিরকাতুল মাফাতিহ : ২/৭৫৫, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)

৬. কবরস্থানে মোমবাতি জ্বালানো ও মসজিদ আলোকসজ্জা করা।

এটাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ, শরিয়তে যার কোনোই ভিত্তি নেই। তাছাড়া এতে অনর্থক কাজে অনেক অর্থের অপচয় হয়, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ। তাই এ থেকে আমাদের পুরোপুরি দূরে থাকতে হবে।

আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি রহ. বলেন :
وَفِي الْقُنْيَةِ وَإِسْرَاجُ السُّرُجِ الْكَثِيرَةِ فِي السِّكَكِ وَالْأَسْوَاقِ لَيْلَةَ الْبَرَاءَةِ بِدْعَةٌ وَكَذَا فِي الْمَسَاجِدِ
‘আল-কুনইয়া গ্রন্থে আছে, শবে বরাতের সময় বাজার, অলিগলি, এভাবে মসজিদে বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা করা বিদআত। (আল-বাহরুর রায়িক : ৫/২৩২, প্রকাশনী : দারুল কিতাবিল ইসলামি, বৈরুত)

সারকথা :

সামগ্রিক বিবেচনায় প্রমাণ হলো যে, শবে বরাত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এ রাতের ফজিলত-সংক্রান্ত কিছু প্রামাণ্য হাদিস রয়েছে। এতে নির্দিষ্ট করে বিশেষ পদ্ধতিতে কোনো আমল নেই। রাতে সাধ্যমতো যেকোনো নফল আমল করা যেতে পারে। রোজা রাখা-সংক্রান্ত বর্ণনাটি মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল, যা পরিত্যাজ্য। তাই এ হাদিসের ভিত্তিতে এককভাবে শবে বরাতের রোজা রাখা যাবে না। মাঝেমধ্যে একাকি কবর জিয়ারত করা যেতে পারে। এছাড়া আমাদের সমাজে শবে বরাত নিয়ে যে বাড়াবাড়ি ও উন্মাদনা রয়েছে, তা কোনোটিই শরিয়াহ-সমর্থিত ও অনুমোদিত নয়। আল্লাহ আমাদের সঠিক ও সুসাব্যস্ত বিধানানুসারে আমল এবং ভুল ও বিদআতমূলক কাজসমূহ থেকে নিবৃত্ত থাকার তাওফিক দান করুন।

© ২০১১ ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

এই সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close