প্রবন্ধ /নিবন্ধ

জিহ্বা সংযত রাখুন⸺নিরাপদ থাকুন

সচেতনতা।

জিহ্বা সংযত রাখুন⸺নিরাপদ থাকুন
সচেতনতা ।
শেষ জমানায় মানুষের জবান বেশি দারাজ হয়ে যাবে। অসংলগ্ন ও অনুচিত কথা অধিকহারে বলতে থাকবে। আর এর কারণে বিভেদ ও বিদ্বেষের আগুনে মানুষ জ্বলতে থাকবে। বিপদের মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাতামাতি করা, প্রজ্জ্বলিত আগুনে ঘি ঢালা এবং দূর থেকে বসে তা উপভোগ করা⸺সবই বর্জনীয় ও নিন্দিত। এগুলো থেকে যে বেঁচে থাকতে পারবে, সেই মুক্তি পাবে, ইনশাআল্লাহ। কথা বেশি বলার মধ্যে উপকারিতা কম, নীরব থাকায়ই লাভ বেশি। সময়ে সময়ে চর্বিতচর্বণ নানা বিষয়ে যেসব বিতর্ক-বিবাদ হয়ে থাকে, তার বেশিরভাগের সূচনাই হয় জিহ্বা থেকে। তাই জিহ্বাকে যে যত বেশি সংযত রাখতে পারবে, তার ওপর যার যত বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সে তত বেশি নিরাপদ থাকবে। অনেক সময় সক্ষমতা থাকলেও বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া উচিত; এটাকে বলে দূরদর্শিতা। কখনোসখনো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুযোগ গ্রহণ না করা উচিত; এটাকে বলে উদারতা। আর কখনোবা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বৃহৎ স্বার্থে নীরব থাকা উচিত; এটাকে বলে বিনয় ও নম্রতা।

বর্তমানে যেমন ইলম ও প্রজ্ঞার দেখা পাওয়া ভার, তার চেয়েও অনেক বেশি বিরল দূরদর্শিতা, উদারতা ও নম্রতার দেখা পাওয়া। বস্তুত জীবনের প্রতিটি যুদ্ধে, প্রতিটি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার দরকার নেই। কখনো বাহ্যত পরাজিত হয়েও আখেরে জয়ী হওয়া যায়। কথাটি যদিও একটু সূক্ষ্ম, তবে ইতিহাসপড়ুয়া ও বিবেকবানদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। ধৈর্যধারণ, রাগ নিয়ন্ত্রণ, ভাষার মিষ্টতা ও উদারতা প্রতিটি দায়ির জন্য আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য। এসব গুণ ভালোভাবে অর্জন না হলে পদে পদে অনেক ধাক্কা খেতে হয়; এমনকি পদস্খলনের আশঙ্কাও থেকে যায়। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের দ্বারা বেশিরভাগেরই হিদায়াত নসিব হয় না; উল্টো এতে মানুষের মধ্যে জিদ, গোঁড়ামি ও দলান্ধতা শিকড় গেড়ে বসে। তাই আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি কথা ও প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সঠিক হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা কাম্য। আজ আর বেশি কিছু বলব না; জাস্ট একটি বিশুদ্ধ হাদিস স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আশা করি, এতে সবার চিন্তার খোরাক হবে।

ইমাম তিরমিজি রহ. বর্নণা করেন :
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ: كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ… ثُمَّ قَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكَ بِرَأْسِ الأَمْرِ كُلِّهِ وَعَمُودِهِ، وَذِرْوَةِ سَنَامِهِ؟ قُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: رَأْسُ الأَمْرِ الإِسْلاَمُ، وَعَمُودُهُ الصَّلاَةُ، وَذِرْوَةُ سَنَامِهِ الجِهَادُ, ثُمَّ قَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكَ بِمَلاَكِ ذَلِكَ كُلِّهِ؟ قُلْتُ: بَلَى يَا نَبِيَّ اللهِ، فَأَخَذَ بِلِسَانِهِ قَالَ: كُفَّ عَلَيْكَ هَذَا، فَقُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللهِ، وَإِنَّا لَمُؤَاخَذُونَ بِمَا نَتَكَلَّمُ بِهِ؟ فَقَالَ: ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا مُعَاذُ، وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ أَوْ عَلَى مَنَاخِرِهِمْ إِلاَّ حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ.
‘মুআজ বিন জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সফরে ছিলাম। …পুনরায় তিনি বললেন, আমি কি সমস্ত কাজের মূল, স্তম্ভ ও সর্বোচ্চ শিখর সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, সকল কাজের মূল হলো ইসলাম, তার স্তম্ভ হলো সালাত, আর তার সর্বোচ্চ শিখর হলো জিহাদ। তিনি আরও বললেন, আমি কি তোমাকে এসব কিছুর সার সম্পর্কে বলব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর নবি। তিনি তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটা সংযত রাখো। আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবি, আমরা যে কথাবার্তা বলি, এগুলো সম্পর্কেও কি আমাদের পাকড়াও (জবাবদিহি করা) হবে? তিনি বললেন, হে মুআজ, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে তো কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (সুনানুত তিরমিজি : ৪/৩০৮, হা. নং ২৬১৬, প্রকাশনী : দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত)

হাদিসটি নিয়ে একটু চিন্তা করুন⸺বেশি না, সামান্য। ‘মানুষকে তো কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ এ অংশটি আবারও পড়ুন, আবারও, আবারও। একটু চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন, আমাদের জবানের হিফজত হচ্ছে তো? আমরা সত্যিই জিহ্বার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করছি তো? ঠাণ্ডা মাথায় এ হাদিসটি নিয়ে চিন্তা করলে অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন, অনেক সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবেন। কী করতে হবে, আর কী করা উচিত বা অনুচিত, তা নতুন করে আর বলে দিতে হবে না। সবার প্রতি একটাই অনুরোধ থাকবে, নীরব থাকুন আর সত্যটা সঠিক উপায়ে খুঁজতে থাকুন। অসংলগ্ন কথা বলে নিজেও বিপদে পড়বেন না, অন্য ভাইদেরও বিপদে ফেলবেন না। সততা, ইখলাস, হিম্মত, বিনয় ও সত্য পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা আপনাকে হতাশ করবে না। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব দেখছেন; তিনিই আপনাকে সঠিক পথ দেখাবেন। আল্লাহ আমাদের পক্ষপাতিত্ব, খিয়ানত, অহংকার, অপবাদ ও হিংসা থেকে রক্ষা করে সত্যানুসন্ধান, সততা, বিনয়, উদারতা ও ধৈর্যসহ সকল উত্তম বৈশিষ্ট্য দান করুন।

© ২০১১ ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

এই সম্পর্কিত আরও পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close